মস্তিষ্ক কাকে বলে ? মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ ও কাজ | What is Brain

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

মস্তিষ্ক কাকে বলে ? মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ ও কাজ | What is Brain

মস্তিষ্ক কাকে বলে – What is Brain : সুপ্রিয় পাঠকগন আমাদের এই নতুন পোষ্টে স্বাগতম , এই পর্বটিতে মস্তিষ্ক কাকে বলে এবং মস্তিষ্কের কাজ ও বিভিন্ন অংশ সম্পর্কে নিঁখুত ভাবে আলোচনা করেছি, যা আপনাদের জন‍্য খুবই হেল্পফুল হবে।

মস্তিষ্ক কাকে বলে :

করোটির মধ্যে সুরক্ষিত মেনিনজেস পর্দাবেষ্টিত কেন্দ্রীয় স্নায়ুতন্ত্রের যে স্ফীত অংশ দেহের বিভিন্ন কাজ নিয়ন্ত্রণ করে তাকে মস্তিষ্ক বলে

মস্তিষ্ক সম্পূর্ণ স্নায়ুকোশ দ্বারা গঠিত। করোটির মধ্যে সুরক্ষিত প্রায় 10,000 মিলিয়ন নিউরোন নিয়ে গঠিত স্নায়ুতন্ত্রের স্ফীতকায় অংশটিকে বলা হয় মস্তিষ্ক। মানুষের মস্তিষ্কের ওজন প্রায় 1200-1400 গ্রাম। মস্তিষ্ক তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত, যথা-A অগ্রমস্তিষ্ক বা প্রোসেনসেফালন B. মধ্যমস্তিষ্ক বা মেসেনসেফালন C. পশ্চাদমস্তিষ্ক বা রম্বেনসেফালন।

A. অগ্রমস্তিষ্ক : মানুষের অগ্রমস্তিষ্ক প্রান্তমস্তিষ্ক বা টেলেনসেফালন ও আন্তরমস্তিষ্ক বা ডায়েনসেফালন নিয়ে গঠিত। প্রাপ্তমস্তিষ্ক তিনটি অংশ নিয়ে গঠিত, যথা-গুরুমস্তিষ্ক, রেখমস্তিষ্ক এবং নাসামস্তিষ্ক। আন্তরমস্তিষ্ক থ্যালামাস, মেটাথ্যালামাস, এপিথ্যালামাস ও হাইপোথ্যালামাস দ্বারা গঠিত।

গুরুমস্তিষ্ক বা সেরিব্রাম মানুষের মস্তিষ্কের সর্ববৃহৎ অংশ। এটি দুটি বৃহৎ খাঁজযুক্ত হেমিস্ফিয়ার নিয়ে গঠিত। প্রতিটি হেমিস্ফিয়ার আবার চারটি লোব বা খণ্ডকে বিভক্ত। ফ্রন্টাল লোব, প্যারাইটাল লোব, অক্সিপিটাল লোব, টেম্পোরাল লোব। দুটি সেরিব্রাল হেমিস্ফিয়ার-এর আয়তন প্রায় 1350 মিলিমিটার। কোনো কোনো বৃহদাকার স্তন্যপায়ী প্রাণীর যেমন তিমির সেরিব্রামের আয়তন এর চেয়েও বেশি। পূর্বে পরিচিত লিম্বিক লোব বর্তমানে পৃথক লিম্বিক তন্ত্র নামে পরিচিত। অ্যামেগডালা, হিপ্পোক্যাম্পাস, থ্যালামাস, হাইপোথ্যালামাস, বেসাল গ্যাংলিয়া ও সিনগুলেট জাইরাস নিয়ে গঠিত তন্ত্রকে লিম্বিক তন্ত্র বলা হয়।

B. মধ্যমস্তিষ্ক : মধ্যমস্তিষ্ক টেকটাম এবং সেরিব্রাল পেডানকল্ নিয়ে গঠিত। টেকটাম চারটি গোলাকার স্ফীতি সুপিরিয়র ও ইনফিরিয়র কলিকুলাসের দ্বারা গঠিত। সেরিব্রাল পেডানকল টেগমেনটাম, সাবস্ট্যানশিয়া নাইগ্রা এবং বেসিক পেডানকুলি এই তিনটি স্তরের দ্বারা গঠিত।

C. পশ্চাদমস্তিষ্ক : পশ্চাদমস্তিষ্ক মেটেনসেফালন ও মায়েলেনসেফালন নিয়ে গঠিত। মেটেনসেফালন অঙ্কদেশীয় পনস বা সেতুমস্তিষ্ক এবং পৃষ্ঠদেশীয় সেরিবেলাম বা লঘুমস্তিষ্কের দ্বারা গঠিত। মায়েলেনসেফালন মেডালা অবলংগাটা ও চতুর্থ মস্তিষ্ক প্রকোষ্ঠের নিম্নাংশ দ্বারা গঠিত।

মস্তিষ্কের প্রধান অংশগুলির বর্ণনা :

A. গুরুমস্তিষ্ক বা সেরিব্রাল কর্টেক্স :

অগ্রমস্তিষ্কের যে অংশ করোটির বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে অবস্থান করে এবং প্রাণীর বুদ্ধি, চিন্তা, স্মৃতি ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে তাকে গুরুমস্তিষ্ক বা সেরিব্রাল কর্টেক্স বা সেরিব্রাম বলে।

গুরুমস্তিকের কাজ :

i. সাধারণ চেষ্টীয় কাজ : দেহের বিভিন্ন অংশের ঐচ্ছিক কার্যকলাপ সেরিব্রাল কর্টেক্সের 4 নং, 6 নং এবং 8 নং অঞ্চল দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়।

ii. বিশেষ চেষ্টীয় কাজ : a. পেশিটান নিয়ন্ত্রণ। b. স্বয়ংক্রিয় এবং পরস্পর সম্পর্কিত কাজের নিয়ন্ত্রণ। c. স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ। d. নিম্নতর চেষ্টীয় কেন্দ্রের ওপর প্রতিরোধমূলক নিয়ন্ত্রণ।

B. থ‍্যালামাস :

মস্তিস্কের তৃতীয় প্রকোষ্ঠের দু-পাশে গুরুমস্তিষ্কের নীচে এবং মধ্যমস্তিস্কের ওপরের শ্বেত বস্তুর মধ্যে যে দুটি ধূসর বর্ণের ডিম্বাকার অংশ থাকে তাদের থ্যালামাস বলে

থ‍্যালামাসের কাজ :

থ্যালামাসের কাজের সংক্ষিপ্তসার নীচে উল্লেখ করা হল-

i. প্রেরক স্থান বা রিলে কেন্দ্র : ঘ্রাণপ্রবাহ ছাড়া সবরকম সংজ্ঞাবহ স্নায়ুপ্রবাহ থ্যালামাসের মধ্য দিয়ে গুরুমস্তিষ্কে প্রবেশ করে। তাই থ্যালামাস গুরুমস্তিষ্কের প্রবেশদ্বার হিসেবে কাজ করে। তাপ, চাপ, স্পর্শ, টান, কম্পন প্রভৃতি উদ্দীপনা পরিবহণকারী ঊর্ধ্বগামী স্নায়ুপথসমূহ মধ্যগ, সুষুম্নাকাণ্ড ও ট্রাইজেমিনাল লেমনিসকাসের মাধ্যমে থ্যালামাসে প্রবেশ করে এবং থ্যালামাসের স্নায়ুকেন্দ্রে স্নায়ুসন্নিধি গঠন করে। থ্যালামাস থেকে উৎপন্ন তৃতীয় পর্যায়ের স্নায়ুতন্তু এরপর স্নায়ুপ্রবাহকে গুরুমস্তিষ্কের সংজ্ঞাবহ অঞ্চল এবং ফ্রন্টাল লোবে প্রেরণ করে। লঘুমস্তিষ্ক থেকে আগত স্নায়ুপ্রবাহকেও থ্যালামাস ফ্রন্টাল লোবের 4 ও 6 নং অঞ্চলে প্রেরণ করে। তা ছাড়া থ্যালামাস গুরুমস্তিষ্কের কোনো কোনো অঞ্চল থেকে আগত স্নায়ুতন্ত্রের প্রেরক স্থান হিসেবেও কাজ করে।

ii. প্রতিবর্তী কেন্দ্র : থ্যালামাস একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবর্তী কেন্দ্র। বিভিন্ন আবেগজনিত প্রতিক্রিয়াগুলি (যেমন- ক্রোধ, পীড়ন ইত্যাদি) থ্যালামাসের মাধ্যমেই সংঘটিত হয়।

iii. ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক আচরণ : গুরুমস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবের মাধ্যমে থ্যালামাস ব্যক্তিত্ব ও সামাজিক আচরণের প্রকাশ ঘটায়।

iv. অমার্জিত ইন্দ্ৰিয়ানুভূতির কেন্দ্রস্থল : থ্যালামাসের পৃষ্ঠমধ্য স্নায়ুকেন্দ্র (medial dorsal nuclei) অমার্জিত ইন্দ্রিয়ানুভূতির আদিম স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। নিম্নশ্রেণির প্রাণী যাদের গুরুমস্তিষ্ক নেই তাদের ক্ষেত্রে এটি উচ্চতর সংজ্ঞাবহ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে।

v. জাগরণ এবং সতর্কীকরণ প্রক্রিয়া : থ্যালামাস দেহের জাগরণ এবং সতর্কীকরণ প্রতিক্রিয়াগুলি নিয়ন্ত্রণ করে। তাই এটি নিদ্রিত প্রাণীকে হঠাৎ জাগিয়ে তোলা এবং পরিবেশ সম্পর্কে তাকে সতর্ক করার ব্যাপারে বিশেষভাবে অংশগ্রহণ করে।

C. হাইপোথ্যালামাস :

মস্তিষ্কের তৃতীয় প্রকোষ্ঠ ও থ্যালামাসের তলদেশে অবস্থিত অগ্রমস্তিষ্কের যে অংশ মানসিক আবেগ, ক্ষুধা, তৃয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে হাইপোথ্যালামাস বলে

C. হাইপোথ‍্যালামাসের কাজ :

হাইপোথ‍্যালামাসের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো হল-

i. স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ : হাইপোথ্যালামাস স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এটি স্বতন্ত্র ও পরাস্বতন্ত্র উভয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াকেই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। হাইপোথ্যালামাসের পশ্চাদদেশীয় নিউক্লিয়াসসমূহ প্রধানত স্বতন্ত্র স্নায়ুতন্ত্রের কার্যাবলির সঙ্গে জড়িত। এসব নিউক্লিয়াসগুলিকে উদ্দীপিত করলে রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন ও এপিনেফ্রিন ক্ষরণ বেড়ে যায়। তা ছাড়া রক্তবাহের সংকোচন, ও তারারন্দ্রের প্রসারণ এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের বিচলন হ্রাস পায়। অপরপক্ষে, হাইপোথ্যালামাসের মধ্যাঞ্চলীয় নিউক্লিয়াসসমূহ পরাস্বতন্ত্র স্নায়ুতন্ত্রের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এসব স্নায়ুকেন্দ্রে উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে তারারম্ভের সংকোচন, রক্তচাপ হ্রাস, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন হারের হ্রাসপ্রাপ্তি ইত্যাদি প্রকাশ পায়।

ii. দেহ উয়তা নিয়ন্ত্রণ : গবেষণামূলক পর্যবেক্ষণে হাইপোথ্যালামাসে দুটি দেহউয়তা নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এর একটি হাইপোথ্যালামাসের সম্মুখভাগে ও অপরটি পশ্চাদভাগে অবস্থিত। এই দুটি উন্নতা নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রের মাধ্যমে হাইপোথ্যালামাস থার্মোস্ট্যাটরূপে কাজ করে দেহউষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যেমন- পরিবেশের উচ্চতা বৃদ্ধিতে হাইপোথ্যালামাসের সম্মুখভাগের নিউক্লিয়াসসমূহ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাহপ্রসারণ ও স্বেদক্ষরণের মাধ্যমে দেহের তাপক্ষয় বৃদ্ধি করে। অপরপক্ষে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় হাইপোথ্যালামাসের পশ্চাদভাগের নিউক্লিয়াসসমূহ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাহ সংকোচন এবং স্বেদক্ষরণের বিলোপ প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহের তাপক্ষয় রোধ করে।

iii. মানসিক আবেগ নিয়ন্ত্রণ : হাইপোথ্যালামাস হাসি, কান্না, ভয়, ক্রোধ, উত্তেজনা, উদবেগ ইত্যাদি মানসিক আবেগের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। দেখা গেছে যে, হাইপোথ্যালামাসের সম্মুখ অংশকে উদ্দীপিত করলে। প্রাণীদেহে মানসিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তা ছাড়া হাইপোথ্যালামাসের অঙ্কীয় অঞ্চল বা স্নায়ুকেন্দ্রসমূহকে বিনষ্ট করলে প্রাণী ক্ষিপ্ত ও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং পর্যবেক্ষককে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। হাইপোথ্যালামাসে ক্ষত সৃষ্টি হলে অট্টহাসি, উচ্চস্বরে কান্না, কৃত্রিম রোধ প্রভৃতি আবেগময় পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। ঘটে, এর সঙ্গে অন্যান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিও প্রকট হয়ে ওঠে।

iv. ক্ষুধা, তৃষ্ণা, খাদ্যগ্রহণ, পরিতৃপ্তি ও স্থূলতা : হাইপোথ্যালামাসের অঙ্কমধ্যস্থ নিউক্লিয়াসের পার্শ্বদেশ ভোজনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই অংশে উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে প্রাণীয় খাদ্যগ্রহণ যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি একে বিনষ্ট করলে খাদ্যগ্রহণ স্পৃহা সম্পূর্ণ লোপ পায়। আবার হাইপোথ্যালামাসের অক্রমধ্যস্থ নিউক্লিয়াসের মধ্য অংশ ‘পরিতৃপ্তি কেন্দ্র হিসাবে কাজ করে। অর্থাৎ এই অংশ বিনষ্ট হলে খাদ্য স্পৃহা বৃদ্ধি পায় প্রাণীস্থূল হয়ে পড়ে এবং উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে খাদ্য স্পৃহা সম্পূর্ণ লোপ পায়। হাইপোথ্যালামাসে একটি তৃয়াকেন্দ্র আছে। ইঁদুরের প্যারাভেন্ট্রিকুলার নিউক্লিয়াসের সন্নিকটস্থ নিউক্লিয়াস সমূহে অতিসারক তরল প্রবেশ করলে প্রাণীর তৃষ্ণা বেড়ে যায়।

D. পনস যোজক বা সেতুমস্তিস্ক :

পশ্চাৎ মস্তিষ্কের যে অংশটি মধ্যমস্তিষ্কের সঙ্গে লঘুমস্তিষ্ক ও সুষুম্নাশীর্ষকের সংযোগ রক্ষা করে তাকে পনস্ বা সেতুমস্তিষ্ক বা মস্তিষ্ক যোজক বলে।

সেতুমস্তিস্কের কাজ :

i. সেতুমস্তিষ্ক বা পনস্-এ পঞ্চম, ষষ্ঠ, সপ্তম ও অষ্টম করোটীয় স্নায়ুর কেন্দ্র অবস্থিত।

ii. পনস্-এর মধ্য দিয়ে ঊর্ধ্বগামী ও নিম্নগামী স্নায়ুপথ অতিক্রম করে।

iii. পনস্-এ অবস্থিত মূত্রনালি নিয়ন্ত্রণ স্নায়ুকেন্দ্র ডেসার পেশির সংকোচন ঘটিয়ে মূত্র-ত্যাগে সহায়তা করে।

iv. পঞ্চম করোটিয় স্নায়ুর স্নায়ুকেন্দ্র চোয়ালের বিচলন নিয়ন্ত্রণ করে।

v. ষষ্ঠ করোটিয় স্নায়ুর স্নায়ুকেন্দ্র অক্ষিগোলকের পাশবিচলন নিয়ন্ত্রণ করে।

vi. পনস্-এ অবস্থিত সপ্তম করোটিয় স্নায়ুর স্নায়ুকেন্দ্র দ্বারা মুখের অভিব্যক্তি ও উত্তোলন এবং লালাক্ষরণ নিয়ন্ত্রিত হয়।

vii. পনস্-এর অ্যাপ্লাসটিক ও নিউমোট্যাক্সিক স্নায়ুকেন্দ্র শ্বাসক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রণে অংশগ্রহণ

viii. দর্শন, শ্রবণ ও অন্তঃকর্ণীয় সংজ্ঞাবহ উদ্দীপনা মধ্যগ অনুদৈর্ঘ্য স্নায়ুগুচ্ছের মধ্য দিয়ে পরিবাহিত হয়ে খাবাপেশি ও অক্ষিপেশির সমন্বয়মূলক বিচলনে সাহায্য করে।

E. লঘুমস্তিষ্ক বা সেরিবেলাম :

দুটি গোলার্ধ নিয়ে গঠিত পশ্চাৎ মস্তিষ্কের যে সর্ববৃহৎ অংশ করোটির পশ্চাদভাগে অবস্থান করে এবং প্রাণীদেহের ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে তাকে লঘুমস্তিষ্ক বা সেরিবেলাম বলে।

লঘুমস্তিস্কের কাজ :

লঘুমস্তিষ্কের কাজের সংক্ষিপ্তসার নীচে উল্লেখ করা হল-

i. প্রত্যাবর্তী স্নায়ুকেন্দ্র : লঘুমস্তিষ্ক একটি প্রত্যাবর্তী স্নায়ুকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। দেহের বিভিন্ন ইন্দ্রিয়স্থান (চক্ষু, কর্ণ, চর্ম, পেশি, কণ্ডরা, পেশিসন্ধি ইত্যাদি) থেকে গৃহীত স্নায়ুপ্রবাহের ওপর ভিত্তি করে লঘুমস্তিষ্ক অনবরত দেহের চেষ্টীয় কার্যের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। এটি সেরিব্রাল কর্টেক্স ও প্রান্তীয় চেষ্টীয় সঞ্চালনের মধ্যে প্রত্যাবর্তী স্নায়ুকেন্দ্ররূপে কাজ করে; অর্থাৎ সেরিব্রাল কর্টেক্স যে চেষ্টীয় কাজের সূচনা করে লঘুমস্তিষ্ক তাকে নিয়ন্ত্রণ করে।

ii. দেহভঙ্গি এবং ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ : লঘুমস্তিষ্কের ফ্লোকুলোনোডুলার লোব ভেস্টিবিউলার যন্ত্রের সঙ্গে যুক্ত থেকে দেহভঙ্গি ও ভারসাম্য নিয়ন্ত্রণ করে। ফ্লোকুলোনোডুলার লোব মূলত ঋজুভাবে দণ্ডায়মান থাকা (standing posture) নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই লোবে ক্ষত সৃষ্টি হলে ঋজুভাবে দাঁড়িয়ে থাকা সম্ভব হয় না। তা ছাড়া ফ্লোকুলোনোডুলার লোবকে বিনষ্ট করলে দেহের ভারসাম্য ব্যাহত হয়, যদিও ঐচ্ছিক চলাফেরার কোনো প্রকার অস্বাভাবিকতা লক্ষ করা যায় না।

iii. পেশিটানের নিয়ন্ত্রণ : আলফা ও গামা এই উভয়প্রকার মোটর নিউরোনের ওপর প্রভাব বিস্তার করে লঘুমস্তিষ্ক পেশির প্রতিবর্ত টানের ওপর প্রভাব বিস্তার করে। লঘুমস্তিষ্কের সম্মুখ লোবের ভারমিস অঞ্চলে উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে পেশি স্পিন্ডলের অন্তর্মুখী প্রবাহ মোক্ষণ হ্রাস পায়। ফলে পেশিটানের হ্রাসপ্রাপ্তি ঘটে। অপরপক্ষে, সম্মুখ লোবের অন্তর্বর্তী অঞ্চলে উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে স্পিন্ডল মোক্ষণ বৃদ্ধি পায়, ফলে পেশিটানের বৃদ্ধি ঘটে।

iv. ঐচ্ছিকসঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ : সেরিব্রাল কর্টেক্সের সঙ্গে স্নায়ু সংযোগের সহায়তায় লঘুমস্তিষ্ক দেহের বিভিন্ন ঐচ্ছিক সঞ্চালন নিয়ন্ত্রণ করে। এর ফলে ঐচ্ছিক সঞ্চালন নির্ভুল হয় এবং সঠিক সময়ে ও সঠিক দিকে সম্পন্ন হয়।

F. সুষুম্নাশীর্ষক বা মেডালা অবলংগাটা বা স্পাইনাল বালব :

পনস্-এর নীচ থেকে শুরু করে সুষুম্নাকাণ্ডের অগ্রভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত শাঙ্কবাকার যে অংশে বিভিন্ন প্রতিবর্ত ক্রিয়া নিয়া হয় তাকে সুষুম্নাশীর্ষক বা মেডালা অবলংগাটা বলে।

সুষুম্নাশীর্ষক বা মেডালা অবলংগাটা এর কাজ :

i. হৃদ্-রক্তবাহ সম্পর্কিত কাজের নিয়ন্ত্রণ : সুষুম্নাশীর্ষক স্বাভাবিক হৃদ্-রক্তবাহ টান বজায় রাখে। দেখা গেছে যে, মস্তিষ্ক-কাণ্ড যদি ক্রমশ ওপর থেকে নীচের দিকে ব্যবচ্ছেদ করা হয় তবে পনস্ বা সেতুমস্তিে মাঝ বরাবর ব্যবচ্ছেদ করলে ধমনি চাপ হ্রাস পায়। ধমনি চাপের হ্রাস আরও তীব্র হয় যদি সুষুম্নাশীর্ষকের ঊর্ধ্বাংশে ব্যবচ্ছেদ করা হয়। পর্যবেক্ষণ থেকে বোঝা যায় যে, সুষুম্নাশীর্ষক রক্তবাহ-সংকোচক টান বজায় রাখে। বেলিসের মতে সুষুম্নাশীর্ষকে বাহ-সংকোচক এবং বাহ-প্রসারক উভয়কেন্দ্রই থাকে এবং এরা পরস্পর বিপরীতধর্মী ক্রিয়া প্রদর্শন করে। এই দুটি কেন্দ্রের বিপরীতধর্মী ক্রিয়ায় হৃৎস্পন্দন হার নিয়ন্ত্রিত হয় বলে ধরে নেওয়া যেতে পারে

ii. শ্বসনক্রিয়া নিয়ন্ত্রণ : সুষুম্নাশীর্ষকের শ্বসনকেন্দ্রের দুটি অংশ আছে- একটি প্রশ্বাসের জন্য এবং অপরটি নিশ্বাসের জন‍্য
কাজ করে। প্রশ্বাসকেন্দ্রটি দেহতরলে কার্বন ডাইঅক্সাইডের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেলে উদ্দীপিত হয় এবং এর ফলে শ্বসনের হার এবং গভীরতা বৃদ্ধি পায়। নিশ্বাসকেন্দ্রটি প্রশ্বাসকেন্দ্রের ওপর নিরোধক ক্রিয়া প্রদর্শন করে।

আরও পড়ুন :

হৃদপিণ্ড কাকে বলে ? হৃদপিন্ডের কাজ, আবরণ, অবস্থান, আকৃতি, প্রাচীর, প্রকোষ্ঠ ও খাঁজ ?

DNA কাকে বলে এর কাজ, গঠন ও প্রকারভেদ ? 

RNA কাকে বলে এর প্রকারভেদ ও গঠন ? 

2 thoughts on “মস্তিষ্ক কাকে বলে ? মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশ ও কাজ | What is Brain”

Leave a Comment