জাদুঘর কাকে বলে ? জাদুঘরের উৎপত্তি, উদ্দেশ্য ও প্রকারভেদ | What is a museum, meaning, origin, purpose, types of museum

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

জাদুঘর কাকে বলে ? জাদুঘরের উৎপত্তি, উদ্দেশ্য ও প্রকারভেদ | What is a museum, meaning, origin, purpose, types of museum

জাদুঘর কাকে বলে ? জাদুঘরের উৎপত্তি, উদ্দেশ্য ও প্রকারভেদ : একটি জাদুঘর হল সমাজের সেবা এবং বিভিন্ন উন্নয়ন মূলক প্রতিষ্ঠান। কখনও কখনও ধর্মীয় অর্থে জাদুঘর সাধারণ এমন একটি জায়গা যেটি শিল্প ও শিক্ষার একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান।চলুন জেনে নেওয়া যাক জাদুঘর কাকে বলে

Table of Contents

জাদুঘর কাকে বলে

সাধারণভাবে বলা যায় জাদুঘর হল বিভিন্ন ঐতিহাসিক উপাদানের সংগ্রহশালা , যেখানে ঐতিহাসিক , সাংস্কৃতিক , বৈজ্ঞানিক , শিল্প – বিষয়ক প্রভৃতি বিভিন্ন ধরনের গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষণ করে তা জনসাধারণের উদ্দেশ্যে স্থায়ী বা অস্থায়ীভাবে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করা হয় । এক কথায় , বিভিন্ন পুরাতাত্ত্বিক নিদর্শন সংগ্রহ করে সেগুলি যেসব প্রতিষ্ঠান বা ভবনে সংরক্ষণ করে রাখা হয় সেসব প্রতিষ্ঠান বা ভবনকে জাদুঘর বলে ।

আন্তর্জাতিক জাদুঘর পর্ষদের অভিমত অনুসারে জাদুঘর কাকে বলে

আন্তর্জাতিক জাদুঘর পর্ষদ অর্থাৎ ICOM (International Council of Museums) জাদুঘরের সংজ্ঞা প্রসঙ্গে বলেছে , জাদুঘর হল অলাভজনক , জনসাধারণের কাছে উন্মুক্ত এবং স্থায়ী সমাজসেবামূলক প্রতিষ্ঠান যা শিক্ষালাভ , জ্ঞানচর্চা ও আনন্দলাভের উদ্দেশ্যে মানব ঐতিহ্যের স্পর্শযোগ্য ও স্পর্শ – অযোগ্য জিনিসপত্র সংগ্রহ করে , সংরক্ষণ করে , প্রদর্শন করে এবং সেগুলি নিয়ে গবেষণা করে।

বাংলা আকাদেমির অভিমত অনুসারে জাদুঘর কাকে বলে

পশ্চিমবঙ্গ বাংলা আকাদেমির ‘ আকাদেমি বিদ্যার্থী বাংলা অভিধান ’ অনুসারে , যে – ঘরে নানা অত্যাশ্চর্য জিনিস বা প্রাচীন জিনিস সংরক্ষিত থাকে তা – ই হল জাদুঘর।

জাদুঘর শব্দের উৎপত্তি

গ্রিক লেখক পেসেনিয়াস – এর লেখা থেকে জানা যায় যে , এক সংগীতজ্ঞ মউসিয়াসের নামানুসারে এক পাহাড়ের নাম হয় “ মউসিয়ন ” (Mouseion)। ঐতিহাসিকদের মতে , এই মউসিয়ন শব্দ থেকে Museum বা জাদুঘর শব্দের উৎপত্তি হয়।

জাদুঘর শব্দের অর্থ

বাংলা জাদুঘর শব্দটির ইংরেজি প্রতিশব্দ হল মিউজিয়াম (Museum)। মিউজিয়াম শব্দের মূল উৎস হল প্রাচীন গ্রিক শব্দ Mouseion যার অর্থ হল গ্রিক পুরাণের শিল্পকলার পৃষ্ঠপোষক মিউজদের মন্দির।

জাদুঘরের উদ্দেশ্য গুলি হল :

বিশ্বের বিভিন্ন দেশে জাদুঘরগুলির সাধারণ উদ্দেশ্য বা কার্যাবলির মধ্যে মিল খুঁজে পাওয়া যায় । জাদুঘরের কয়েকটি উদ্দেশ্য নীচে আলোচনা করা হল-

1. প্রত্ননিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ : জাদুঘরের একটি প্রধান উদ্দেশ্য হল বিশ্বের বিভিন্ন দেশের , বিভিন্ন যুগের নানা নিদর্শন সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করা । জাদুঘরে প্রাচীন মুদ্রা , লিপি , নানা শিল্পকর্ম ( ভাস্কর্য , স্থাপত্য , চিত্রকলা ) , দুষ্প্রাপ্য পুরাবস্তুসমূহ এবং নানা মডেল ও চার্ট সংরক্ষিত রাখা থাকে।

2. প্রতিকৃতি নির্মাণ : জাদুঘরগুলি বিভিন্ন প্রাচীন , আধুনিক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক নিদর্শনের বা ক্রিয়াকলাপের বা বস্তুসমূহের বা ব্যক্তিসমূহের মডেল ( Replica ) নির্মাণ করে । এই মডেলগুলি দর্শকদের দেখানোর লক্ষ্যে সাজিয়ে রাখা হয়ে থাকে।

কিংবদন্তি কাকে বলে ?

3. অতীত সমাজ – সভ্যতার ধারণা দান : জাদুঘরে যে সমস্ত জিনিস সাজিয়ে রাখা হয় সেগুলি থেকে আমরা অতীত সমাজসভ্যতা সম্পর্কে এক সাধারণ ধারণা পেয়ে থাকি । বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে মানবসমাজ ও সভ্যতার যে অগ্রগতি ঘটেছে তার বিভিন্ন নিদর্শন ও স্মৃতিচিহ্নের আভাস মেলে জাদুঘরে সংরক্ষিত বিভিন্ন প্রত্ননিদর্শন গুলির মাধ্যমে।

4. স্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের সংগ্রহশালা নির্মাণ : বিশ্বের বেশ কয়েকটি জাদুঘরকে সম্পূর্ণরূপে বা আংশিকভাবে বিশ্বের জনপ্রিয় ও স্মরণীয় ব্যক্তিত্বদের মূর্তির সংগ্রহশালা হিসেবে গড়ে তোলা হয়েছে । এ প্রসঙ্গে মাদাম তুসোর জাদুঘরটির কথা উল্লেখ করা যায় । এই জাদুঘরটিতে ঐতিহাসিকভাবে স্বীকৃত রাজকীয় ব্যক্তিত্ব , ক্রীড়াতারকা , বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাজনৈতিক নেতৃবর্গ , সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এমনকি চলচ্চিত্রের জনপ্রিয় নায়ক – নায়িকাদের মোমের মূর্তি সংরক্ষিত করা রয়েছে।

জাদুঘরের প্রকারভেদ

জাদুঘরের প্রকারভেদ গুলি নিচে আলোচনা করা হল-

1.সাধারণ জাদুঘর

i.বহুমুখী জাদুঘর : যে জাদুঘরে একটি স্থানে নানা ধরনের সংগ্রহ গড়ে তোলা হয় , তাকে বহুমুখী জাদুঘর বলা হয় । অষ্টাদশ শতকে মূলত ব্যক্তিগত উদ্যোগে এই ধরনের জাদুঘর গড়ে তোলা হয় । সংগ্রহ করা বিভিন্ন শিল্প – স্থাপত্যকীর্তির নমুনা , চিত্র , পাণ্ডুলিপি , অস্ত্রশস্ত্র , বস্ত্র ও অন্যান্য নিদর্শন এই জাদুঘরে সাজিয়ে রাখা হয় । উদাহরণ : সালারজং জাদুঘর (হায়দ্রাবাদ) ,ভারতীয় জাদুঘর (কলকাতা)।

ii.শিশু জাদুঘর : ১২ বছর বয়স পর্যন্ত শিশুদের জন্য গড়ে তোলা হয় শিশু জাদুঘর । এই ধরনের জাদুঘরে প্রদর্শিত হয় এমন জিনিসপত্র , যেগুলি এই বয়সের শিশুদের জ্ঞানের পরিধি বাড়াতে সাহায্য করে । এই ধরনের জাদুঘর প্রতিষ্ঠার অন্তরালে অনুপ্রেরণা রয়েছে , জার্মান শিক্ষাবিদ ফ্রয়েবেল এবং ইতালীয় শিক্ষাবিদ মন্তেস্বরীর । এদের তত্ত্বানুসারে এই ধরনের জাদুঘরে শিশুদের উপযোগী বসে আঁকা নানা মডেল তৈরি , ক্যুইজ প্রতিযোগিতা ,লুকোচুরি খেলা , সৃজনশীল রচনা ইত‍্যাদির আয়োজন থাকে।

সাধারণ জাদুঘরের উদাহরণ :

মাউন্ট রায়ান্ড চিলড্রেন্স মিউজিয়াম , আলজিয়ার্স প্রভৃতি।

2 কলা জাদুঘর

i.শিল্পসংরক্ষণ জাদুঘর : শিল্পসংরক্ষণ জাদুঘরে বিভিন্ন মৃৎশিল্প , ধাতুর ফলকে খোদিত ভাস্কর্য এবং কারুকার্যময় নানাধরনের শিল্পকীর্তি স্থান পায় । এই সমস্ত শিল্পনমুনাগুলি বিশেষভাবে এক একটি ঘরে সাজানো থাকে । উদাহরণ : আশুতোষ মিউজিয়াম অব ইন্ডিয়ান আর্ট (কলকাতা)।

ii.আধুনিক কলা জাদুঘর :  সমসাময়িক শিল্পনমুনাগুলি যে জাদুঘরে পরীক্ষণীয় স্তরে থাকে এবং প্রদর্শিত হয় , তাকে আধুনিক কলা জাদুঘর বলে । উদাহরণ : হংকং – এর কলা জাদুঘর (জাপান)।

iii.লোককলা ও কারুশিল্প জাদুঘর : বিভিন্ন দেশের লোকশিল্প ও কারুশিল্পজাত নমুনাগুলি যে জাদুঘরে সাজিয়ে রাখা হয় , তাকে লোককলা ও কারুশিল্প জাদুঘর বলে । এই জাদুঘরে সংরক্ষিত লোক ও কারুশিল্পের নিদর্শনগুলি মাটি , কাঠ , বাঁশ , চামড়া , শিং , হাড় , দাঁত প্রভৃতি উপকরণ দিয়ে তৈরি হয় । এই জাদুঘরে সংরক্ষিত থাকে পুতুল , সূচীশিল্প নমুনা , বাসনপত্র , বাদ্যযন্ত্র , অলংকার প্রভৃতি । এক্ষেত্রে শিল্পদ্রব্য ও প্রতিকৃতি প্রদর্শন উল্লেখযোগ্য । উদাহরণ : ন্যাশনাল ফোক অ্যান্ড ক্রাফট মিউজিয়াম , নিউদিল্লি (ভারত)।

3.ঐতিহাসিক জাদুঘর

i. প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর : যে জাদুঘরে প্রাগৈতিহাসিক ও ঐতিহাসিক যুগের নানা নিদর্শন সংরক্ষিত হয় , তাকে প্রত্নতাত্ত্বিক জাদুঘর বলে।

উদাহরণ: ন্যাশনাল আর্কিওলজিক্যাল মিউজিয়াম (গ্রিস)।

ii. ব্যক্তি বিষয়ক জাদুঘর : বিশ্বের বিভিন্ন দেশের বিশিষ্ট ব্যক্তির ব্যবহৃত দ্রব্যসামগ্রী স্মৃতি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয় যে জাদুঘরে তা হল ব্যক্তি বিষয়ক জাদুঘর । এখানে সংরক্ষিত থাকে বিখ্যাত ব্যক্তিদের চিঠিপত্র , দিনলিপি , ছবি , সমসাময়িক নথিপত্র প্রভৃতি।

উদাহরণ : জোড়াসাঁকো ঠাকুরবাড়ি (কলকাতা)।

iii. স্মৃতি জাদুঘর : মহান ঐতিহাসিক ব্যক্তিদের ও তাদের সমসাময়িক ঘটনাবলিকে স্মরণ করার জন্য যে জাদুঘর প্রতিষ্ঠা করা হয় , তাকে স্মৃতি জাদুঘর বলে। রাজপ্রাসাদের জাদুঘরগুলিও এই পর্যায়ে পড়ে।

উদাহরণ : ভিক্টোরিয়া মেমোরিয়াল হল (কলকাতা)।

4. বিজ্ঞান বিষয়ক জাদুঘর

i.ভূতাত্ত্বিক জাদুঘর : ভূতাত্ত্বিক ধারণাদানে সাহায্য করে এমন কিছু নিদর্শনের দ্বারা এই মিউজিয়াম গড়ে তোলা হয় । খনিজ , পাথরের টুকরো , জীবাশ্মগুলি ছাড়াও এখানে ভূতাত্ত্বিক নীতি ও পদ্ধতিগুলি প্রদর্শিত হয়।

উদাহরণ : শিবপুরের বোটানিক্যাল গার্ডেন (পশ্চিমবঙ্গ)

ii.প্রাণীবিদ্যা জাদুঘর : বনভূমি থেকে সংগ্রহ করা জীবন্ত প্রাণীদের স্থায়ীভাবে প্রদর্শিত করা হয় যে সুবিশাল অঞ্চল জুড়ে তাই ই প্রাণীবিদ্যা জাদুঘর। বন্য ও গৃহপালিত প্রাণীদের শিক্ষামূলক ও বিজ্ঞানধর্মী অনুসন্ধানের সুযোগ করে দেয় এই ধরনের জাদুঘর।

উদাহরণ : দ্য জুলজিক্যাল গার্ডেন (কলকাতা)।

iii.বিজ্ঞান জাদুঘর : যে জাদুঘর সাধারণ বিজ্ঞান , ভৌতবিজ্ঞানের বিবর্তন , বিজ্ঞানধর্মী ধারণা ও উপকরণ , বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত বিবর্তনের নিদর্শন সংগ্রহ , সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করে থাকে তাকে বলে বিজ্ঞান জাদুঘর। বিজ্ঞান জাদুঘরের ক্ষেত্রে প্রাকৃতিক ইতিহাস জাদুঘরও উল্লেখযোগ্য।

উদাহরণ : মিউজিয়াম অব সায়েন্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রি (শিকাগো)।

আরও পড়ুন :

রুশ বিপ্লব কি ? রুশ বিপ্লবের রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক কারণ 

চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের কারণ, বৈশিষ্ট্য, সুফল ও কুফল 

রায়তওয়ারি বন্দোবস্ত কি ? এই বন্দোবস্তের বৈশিষ্ট্য ও ফলাফল

জাদুঘর সম্পর্কিত প্রশ্ন উত্তর :

1. চলমান জাদুঘর কাকে বলে ?

উ: কোন চলমান যান ব‍্যবহারের মাধ‍্যামে নানান জায়গায় ঘুরে ঘুরে ঐতিহাসিক নিদর্শন সমূহ যখন দর্শকদের দেখানো হয় তখন তাকে চলমান জাদুঘর বলে।

2. ভারতের প্রথম জাদুঘর কবে এবং কোথায় স্থাপিত হয় ?

উ: 1814 সালে কলকাতায়

3. পৃথিবীর বৃহত্তম জাদুঘর কোনটি ?

উ:ল‍্যুভর মিউজিয়াম যেটিফ্রান্সের প‍্যারিসে অবস্থিত।

4.ভারতের সবচেয়ে ছোট জাদুঘর কোনটি ?

উ:স্টোক প‍্যালেস মিউজয়াম

5. বিশ্বের প্রাচীনতম জাদুঘর কোনটি ?

উ:ক‍্যাপিটোলাইন মিউজিয়াম , রোম

6.কানাডার বৃহত্তম জাদুঘর কোনটি ?

উ:রয়‍্যাল অন্টারিও মিউজিয়াম

7.মোনালিসা চিত্রটি কোন জাদুঘরে রয়েছে ?

উ: ল‍্যুভর মিউজিয়াম , ফ্রান্স

8.ভ‍্যাটিকান সিটি মিউজিয়াম কে প্রতিষ্ঠা করে ?

উ:পোপ জুলিয়াস দ্বিতীয়

9.ভারতের প্রাচীনতম জাদুঘর কোথায় অবস্থিত ?

উ: কলকাতা

10. কোন জাদুঘরে মৃত সাগরের স্ক্রোল রয়েছে ?

উ: কিতাবের মাজার,ইসরাইল

2 thoughts on “জাদুঘর কাকে বলে ? জাদুঘরের উৎপত্তি, উদ্দেশ্য ও প্রকারভেদ | What is a museum, meaning, origin, purpose, types of museum”

Leave a Comment