মূত্র কি বা কাকে বলে ? মূত্রের বৈশিষ্ট্য ও মূত্র উৎপাদন পদ্ধতি

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

মূত্র কি বা কাকে বলে ? মূত্রের বৈশিষ্ট্য ও মূত্র উৎপাদন পদ্ধতি

মূত্র কি – What is Urine : প্রিয় পাঠকগন আমাদের এই নতুন পোষ্টে স্বাগতম , এই পর্বটিতে আমরা মূত্র কি বা মূত্র কাকে বলে এবং মূত্রের বৈশিষ্ট্যমূত্র উৎপাদন পদ্ধতি সম্পর্কে নিঁখুত ভাবে আলোচনা করেছি, যা আপনাদের জন‍্য খুবই হেল্পফুল হবে। চলুন দেখে নেওয়া যাক মূত্র কি। 

◆ মূত্র কি :

মূত্র হল মেরুদণ্ডী প্রাণীদের নাইট্রোজেনযুক্ত জলীয় রেচন পদার্থ। স্বাভাবিক মূত্র স্বচ্ছ, হালকা হলুদ রঙের, ঈষৎ লবণাক্ত, অম্লধর্মী এবং অ্যারোমেটিক গন্ধযুক্ত হয়ে থাকে।

◆ মূত্রের বৈশিষ্ট্য :

মূত্রের গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্যগুলি হল-

1. বর্ণ : স্বাভাবিক মূত্র ফিকে হলুদ বর্ণের। মূত্রে ইউরোক্রোম নামক রঞ্জক থাকায় মূত্রকে হালকা হলুদ দেখায়। জন্ডিস রোগে মূত্র গাঢ় হলুদ বর্ণ ধারণ করে। তখন মূত্রে পিত্তরঞ্জক (বিলিরুবিন) নির্গত হয়। এ ছাড়া মূত্রের পরিমাণ কমে গেলে, ভিটামিন B2 গ্রহণ করলেও মূত্র হলুদ হয়। জ্বরের সময় মূত্র পিঙ্গল বা হলুদ বর্ণ ধারণ করে। যকৃৎ রোগে মূত্র সবুজ বর্ণের হতে পারে। রক্ত উপস্থিত থাকলে মূত্র গাঢ় লাল হয়। মেসোগ্লোবিন-এর উপস্থিতিতে মূত্র বাদামি বর্ণ ধারণ করে।

2. পরিমাণ : প্রাপ্তবয়স্ক লোকের প্রত্যহ গড়ে 1-1.5 লিটার মূত্র উৎপন্ন হয়। একজন বয়স্ক লোকের মূত্রের পরিমাণ 600-2500 মিলিলিটার। মূত্রের প্রায় অর্ধেকই ঘুমের সময় উৎপন্ন হয়। জলগ্রহণ, খাদ্যের তারতম্য, পরিবেশজাত উন্নতা, শারীরিক ও মানসিক অবস্থা ইত্যাদির ওপর মূত্র উৎপাদন নির্ভর করে।

3. আপেক্ষিক গুরুত্ব : মূত্রের স্বাভাবিক আপেক্ষিক গুরুত্ব 1.01 -1.05। অত্যধিক জলপান করলে মূত্রের আপেক্ষিক গুরুত্ব 1.003- তে নেমে আসে এবং রক্তের গাঢ়ত্ব বৃদ্ধি পেলে মূত্রের আপেক্ষিক গুরুত্ব 1.040-তে উঠে আসে।

4. বিক্রিয়া : তাজা মূত্র স্বচ্ছ ও অম্লধর্মী হয়। মূত্রের pH 4.5-8.2 পর্যন্ত হতে পারে। 24 ঘণ্টায় সংগৃহীত মিশ্র মূত্রের গড় pH 6। খাদ্য গ্রহণের পরমূহূর্তে ক্ষারীয় হয়। উচ্চমাত্রার প্রোটিন এবং আমিষ খাদ্য গ্রহণে মূত্র আম্লিক হয়, কিন্তু নিরামিষ খাদ্যগ্রহণে মূত্র ক্ষারীয় হয়।

5. গন্ধ : মূত্রের গন্ধ অনেকটা অ্যারোমেটিক। মূত্রে উদ্বায়ী জৈব পদার্থের উপস্থিতির জন্য এমন গন্ধ হয়। এ ছাড়া দুর্গন্ধযুক্ত পদার্থ ইউরিনোডের উপস্থিতির জন্য মূত্রে গন্ধ হয়। স্বাভাবিক মূত্রকে ফেলে রাখলে মূত্রে অ্যামোনিয়ার গন্ধ হয়। মূত্রের ইউরিয়া জীবাণুর সংস্পর্শে এসে অ্যামোনিয়ায় রূপান্তরিত হয়।

◆ মূত্র উৎপাদন পদ্ধতি :

মানবদেহে মূত্র উৎপাদন প্রণালী সম্পর্কে লাডউইগ, ব্যোওম্যান, স্টার্লিং প্রমুখ বিজ্ঞানীরা ভিন্ন ভিন্ন মত পোষণ করেন। বিজ্ঞানী কুশনি মূত্র উৎপাদন সম্পর্কে যে সর্বাধুনিক মতবাদ প্রকাশ করেছেন তা তিনটি স্বতন্ত্র তত্ত্বের সমন্বয়ে গঠিত। তত্ত্বগুলি নীচে দেওয়া হল-

মূত্র উৎপাদন তিনটি পর্যায়ে বিভক্ত, যথা-1. গ্লোমেরুলাসে পরাপরিস্রাবণ, 2. বৃক্কীয় নালিকার পুনর্বিশোষণ এবং 3. বৃক্কনালিকার ক্ষরণ।

1. গ্লোমেরুলাসে পরাপরিস্রাবণ :

প্রতি মিনিটে বৃক্কের মাধ্যমে 125ml রক্ত পরিস্রুত হয়। অন্তর্মুখী ধমনিকা দিয়ে রক্ত গ্লোমেরুলাসে আসে। অন্তর্মুখী ধমনিকা অপেক্ষা গ্লোমেরুলাসে জালকের প্রাচীরের ব্যাস খুব কম হওয়ায় গ্লোমেরুলাসে রক্তচাপ বেড়ে যায়, ফলে রক্তের জলীয় অংশ পরিস্রুত হয়ে ব্যোওমানের ক্যাপসুলের গহ্বরে প্রবেশ করে। গ্লোমেরুলার পরিস্রুত তরলে জল এবং জলে দ্রবীভূত পদার্থ যেমন-ইউরিয়া, ইউরিক অ্যাসিড, ক্রিয়েটিনিন, অ্যামাইনো অ্যাসিড, গ্লুকোজ, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ভিটামিন ইত্যাদি থাকে। কিন্তু প্রোটিন ও ফ্যাট থাকে না।

2. বৃক্কীয় নালিকার পুনর্বিশোষণ :

ব্যোওম্যানের ক্যাপসুল থেকে পরিস্রুত তরল পরাসংবর্ত নালিকায় প্রবেশ করে। এখানে পরিস্রুত তরলের নির্বাচিত পদার্থ পুনর্বিশোষিত হয়ে রক্তে প্রবেশ করে। পুনর্বিশোষণ সক্রিয় ও নিষ্ক্রিয় পরিবহণ পদ্ধতিতে সম্পন্ন হয়। বৃক্ক নালিকার বিভিন্ন অংশে যে সব পদার্থের পুনর্বিশোষণ সম্পন্ন হয় তা হল-

a. পরাসংবর্ত নালিকা : এখানে পরিস্রুত তরলের প্রায় 60% পুনৰ্বিশোষিত হয়, গ্লুকোজ, অ্যামাইনো অ্যাসিড, ভিটামিন, হরমোন, সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্লোরাইড, ফসফেট, বাইকার্বনেট, জল এবং কিছুটা ইউরিয়া এই অংশে পুনর্বিশোষিত হয়।

b. হেনলির লুপ : এখানে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, ক্লোরাইড ইত্যাদি পুনৰ্বিশোষিত হয়।

c. দূরসংবর্ত নালিকা : এখানে সোডিয়াম, পটাশিয়াম, হাইড্রোজেন ও ক্লোরিন আয়ন পুনর্বিশোষিত হয়। অ্যান্ডোস্টেরন হরমোন এই প্রক্রিয়ায় সাহায্য করে। অপরপক্ষে ADH জলের পুনর্বিশোষণে সাহায্য করে। এই কারণে ADH ক্ষরণ হ্রাস পেলে জলের পুনর্বিশোষণ হয় না ফলে বহুমূত্র বা ডায়াবেটিস ইনসিপিডাস রোগ হয়।

d. সংগ্রাহী নালিকা : ADH এর প্রভাবে এখানে প্রধানত জল পুনর্বিশোষিত হয়। এছাড়া অল্প পরিমাণ সোডিয়াম আয়ন অ্যান্ডোস্টেরনের প্রভাবে পুনর্বিশোষিত হয়। পুনর্বিশোষণের পর পরিস্রুত তরল গাঢ় হয়ে মূত্রে পরিণত হয় এবং বৃক্ক নালিকা থেকে গবিনীতে প্রবেশ করে।

3. টিউবিউলার ক্ষরণ :

পুনর্বিশোষণ কালেই বৃক্কনালিকার গাত্র থেকে কয়েকটি পদার্থ ক্ষরিত হয়ে মূত্রে মেশে। এই সব ক্ষরিত পদার্থগুলি হল- ক্রিয়েটিনিন, হিপিউরিক অ্যাসিড, H+, অ্যামোনিয়া, ইউরিয়া, পটাশিয়াম, অ্যামোনিয়া, HCO3 – ইত্যাদি।

সুতরাং গ্লোমেরুলাসে পরিস্রুত হয়ে ক্ষরিত পদার্থ সহ অপেক্ষাকৃত গাঢ় যে জলীয় তরল সংগ্রাহী নালিতে জমা হয় তাকে মূত্র বলে ।

আরও পড়ুন :

DNA কাকে বলে ? এবং প্রকারভেদ, গঠন ও কাজ ? 

RNA কাকে বলে ? এবং প্রকারভেদ ও গঠন ? 

হৃৎপিণ্ড কাকে বলে ? হৃৎপিণ্ডের অবস্থান, আকৃতি, আবরণ, খাঁজ, প্রাচীর, প্রকোষ্ঠ, কপাটিকা, ছিদ্র সম্পর্কে আলোচনা ? 

Leave a Comment