পেশি কলা কাকে বলে ? পেশি কলার বৈশিষ্ট্য, উৎস, উপাদান, কাজ ও প্রকারভেদ

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

পেশি কলা কাকে বলে : সুপ্রিয় পাঠকবন্ধুরা আমাদের এই নতুন পোষ্টে স্বাগতম , এই পর্বটিতে আমরা পেশি কলা কাকে বলে এবং পেশি কলার কাজ, উৎস, বৈশিষ্ট্য, উপাদান, ও প্রকারভেদ সম্পর্কে নিখুঁত ভাবে আলোচনা করেছি, যা আপনাদের জন‍্য খুবই হেল্পফুল হবে। চলুন দেখে নেওয়া যাক পেশি কলা কাকে বলে ।

পেশি কলা কাকে বলে ? পেশি কলার বৈশিষ্ট্য, উৎস, উপাদান, কাজ ও প্রকারভেদ

পেশি কলা :

পেশি কলা দেহের গমন এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গের আকারের পরিবর্তনের জন্য দায়ী। এর বিশেষত্ব হল এটি বিশেষ ধরনের কোশগুচ্ছ নিয়ে গঠিত, যাকে পেশি কোশ বলে, এবং যাদের প্রাথমিক ভূমিকা হচ্ছে সংকোচন। পেশি কোশগুলি লম্বাটে এবং সমান্তরাল ভাবে থাকে এবং কার্যকারী এককরূপে কাজ করে। পেশি কোশের সাইটোপ্লাজমে বেশিরভাগ অংশই দখল করে থাকে দু-ধরনের মায়োফিলামেন্ট যারা সংকোচন কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মায়োফিলামেন্ট দু-রকমের, যথা-

a. পাতলা ফিলামেন্ট : এগুলি 6-9 nm ব্যাসযুক্ত এবং প্রাথমিকভাবে অ্যাকটিন প্রোটিন দ্বারা গঠিত।

b. পুরু ফিলামেন্ট : এগুলি প্রায় 15 nm ব্যাসযুক্ত এবং মায়োসিন প্রোটিন দ্বারা গঠিত।

◆পেশি কলার উৎস :

i. পেশি কলা উৎপন্ন হয় মেসোডার্ম নামক ভ্রূণস্তর থেকে।
Ii. এক্টোডার্ম নামক ভ্রূণস্তর থেকে উৎপন্ন হয় লোমকূপের গোড়ার পেশি, স্ফিংটার, ডায়ালেটর পিউপিলী এবং আইরিশ, ঘর্মগ্রন্থির মায়ো এপিথেলীয় কোশ।

◆পেশি কলা কাকে বলে :

মায়োফাইব্রিলযুক্ত পেশি কোশ দ্বারা গঠিত সংকোচনশীল কলাকে পেশি কলা বলে।

◆পেশি কলার বৈশিষ্ট্য :

i. পেশি কলা পেশি কোশ (পেশিতন্তু), যোগ কলা, স্নায়ু এবং স্নায়ুপ্রান্ত দ্বারা গঠিত।

ii. পেশি কোশগুলি লম্বাকৃতি হওয়ার জন্য এদের পেশিতত্ত্বও বলে।

iii. পেশি কলা কতকগুলি পেশি কোশ দ্বারা গঠিত।

iv. কোশে একাধিক নিউক্লিয়াস থাকে।

v. স্থিতিস্থাপকতা, সংবহনশীলতা পেশি কলার ধর্ম।

vi. পেশি কলার শক্তির উৎস খাদ্যের বিপাকজনিত শক্তি থেকে।

vii. পেশি কোশের সাইটোপ্লাজমকে বলে সারকোপ্লাজম এবং কোশাবৃত পর্দাকে বলে সারকোলেমা। সারকোমিয়ার হল পেশি কোশের সংকোচনশীল একক।

viii. পেশি কলা রাসায়নিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

◆পেশি কলার উপাদান :

a. জল – 75% ।

b.  বিভিন্ন প্রকার প্রোটিন (যথা—অ্যাকটিন, মায়োসিন, অ্যাক্টোমায়োসিন কমপ্লেক্স, ট্রোপোমায়োসিন-a ও b, মায়োজেন, মায়োঅ্যালবুমিন, মায়োগ্লোবিউলিন ইত্যাদি) – 20% ।

c. স্নেহ পদার্থ (ফসফোলিপিড ও কোলেস্টেরল) – 0.2% ।

d. শর্করা (গ্লাইকোজেন) – 10% ।

e. অজৈব লবণ (পটাশিয়াম ফসফেট, ক্যালশিয়াম, সোডিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম )-1.5% ।

◆পেশি কলার কাজ :

পেশিকলার বিভিন্ন কাজগুলি হল-

i. পেশি কলার প্রধান ভূমিকা হল দেহের অঙ্গপ্রত্যঙ্গের সঞ্চালন ঘটানো এবং জীবের গমনে সাহায্য করা।

ii. দেহের কঙ্কালতন্ত্রকে অবলম্বন দেওয়া এবং বিভিন্ন অভ্যন্তরীয় অঙ্গকে সুরক্ষা প্রদান করা।

iii. মুখের অভিব্যক্তি ঘটাতে এবং দৈহিক অবস্থানের পরিবর্তন ঘটাতে সাহায্য করে।

iv. পেশি কলা দেহের ভারসাম্য বজায়ে সহযোগিতা করে।

v. বিভিন্ন অবস্থায় পেশি খাদ্য গলাধঃকরণে, পৌষ্টিক নালির বিচলনে, মূত্রনালি ও ফ্যালোপিয়ান নালির পেরিস্টলসিক চলনে অংশ নেয়।

vi. হৃৎস্পন্দন, শব্দ সৃষ্টি, নিশ্বাস-প্রশ্বাসে পেশি কলার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে।

vii. ঐচ্ছিক পেশি অস্থির সঙ্গে যুক্ত থাকে ফলে প্রাণীরা ইচ্ছা অনুযায়ী দেহ সঞ্চালনে সক্ষম।

viii. অনৈচ্ছিক পেশিও অনেক ক্ষেত্রে দেহ অভ্যন্তরস্থ অঙ্গের সঞ্চালন ঘটায়।

ix. রক্তপ্রবাহ অক্ষুণ্ণ থাকে রক্তবাহের মধ্যে এবং তা সম্ভব হয় হৃদপেশির সংকোচন ও প্রসারণের ফলে।

x. দেহের তাপমাত্রা বজায় রাখে ।

xi. রক্তচাপ নিয়ন্ত্রিত হয় রক্ত নালির পেশির দ্বারা ।

xii. এই কলাই স্নায়ুতন্ত্রের কার্যকারিতার বহিঃপ্রকাশ ঘটায় ।

◆পেশির প্রকারভেদ :

পেশি কলা কত প্রকার ও কি কি তা সম্পর্কে নীচে আলোচনা করা হল সংকোচনশীল এককের ভিত্তিতে পেশিকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে, যেমন- 1. অনৈচ্ছিক পেশি বা অরেখ পেশি বা মসৃণ পেশি 2. ঐচ্ছিক পেশি বা সরেখ পেশি বা কঙ্কাল পেশি 3.  হৃদপেশি

1. অনৈচ্ছিক পেশি কাকে বলে :

অনুপ্রস্থ রেখাবিহীন, স্বেচ্ছায় সংকোচনশীল নয় এমন পেশিকে অনৈচ্ছিক পেশি বলে।

বিস্তৃতি : হৃৎপিণ্ড ব্যতিরেকে বেশিরভাগ দেহ অভ্যন্তরস্থ অঙ্গই এই পেশি দ্বারা গঠিত। গ্রাসনালি, পাকস্থলী, ক্ষুদ্রান্ত্র, বৃহদন্ত্র, জরায়ু, মূত্রথলি, শ্বাসনালি, পিত্তথলি, গ্রন্থির নালিসমূহ, শিরা ও ধমনির প্রাচীর এবং আবরক ঝিল্লী এই পেশি দ্বারা গঠিত। ইচ্ছাশক্তির দ্বারা এই পেশি পরিচালিত হয় না, তবে স্বয়ংক্রিয় স্নায়ু একে নিয়ন্ত্রণ করে। তাছাড়া arrector pilli muscle, ডারটস পেশি, চক্ষুর আইরিশ এবং সিলিয়ারি পেশিতে এই প্রকার পেশি দেখা যায়।

অনৈচ্ছিক পেশির বৈশিষ্ট্য :

অনৈচ্ছিক পেশির গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য গুলি হল-

i. পেশিতন্তুগুলি অপেক্ষাকৃত ক্ষুদ্র।

ii. পেশির উভয় প্রান্ত সূচালো, দৈর্ঘ্যে 40-80 u এবং প্রস্থে 0.06-1.0 u হয়।

iii. পেশি কোশগুলি সারকোলেমাযুক্ত তবে অস্পষ্ট। লম্বালম্বি ডোরাকাটা।

iv. ধাত্রবস্তু দ্বারা কতকগুলি পেশি তন্তু পরস্পর যুক্ত থাকে।

v. কোশে নিউক্লিয়াসের সংখ্যা এক বা দুটি, অবস্থান পেশির মধ্যবর্তী স্ফীত অংশে। নিউক্লিয়াস দণ্ডাকার বা উপবৃত্তাকার।

vi. সাইটোপ্লাজমের সংকোচনী উপাদান হল অ্যাকটিন ও মায়োসিন।

vii. বড়ো পেশিগুচ্ছে স্থূল শ্বেততত্ত্ব ও স্থিতিস্থাপক তন্তু থাকে।

viii. এই পেশিতে কন্ডরা অনুপস্থিত কারণ বেশির ভাগ পেশিই নরম দেহাংশের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

ix. নিউক্লিয়াসের কাছে লম্বা মাইটোকন্ড্রিয়া, দানাদার ER এবং গলগি বডি থাকে। গ্লাইকোজেন দানা যথেষ্ট পরিমাণে থাকে।

x. পেশিতন্তুর চারপাশে যোগকলার আবরণী থাকে।

xi. পেশিতে নিউক্লিওপ্রোটিনের ভাগ বেশি থাকে।

2. ঐচ্ছিক পেশি কাকে বলে :

অনুপ্রস্থ ব্যান্ডযুক্ত, অস্থির সঙ্গে সংলগ্ন এবং স্বেচ্ছায় সংকুচিত হতে পারে এমন পেশিকে সরেখ পেশি বা ঐচ্ছিক পেশি বলে।

ঐচ্ছিক পেশির বৈশিষ্ট্য :

i. পেশি তত্ত্ব বেলনাকার নিরেট ও সূক্ষ্ম, দীর্ঘ, শাখা-প্রশাখাবিহীন। দেহের ওজনের প্রায় 40% হল ঐচ্ছিক পেশি।

ii. পেশি তন্তু দৈর্ঘ্যে 1-40mm এবং প্রস্থে 10-100 um

iii. পেশি অস্থির সঙ্গে সংলগ্ন থাকে। কোশে নিউক্লিয়াসের সংখ্যা একাধিক এবং তা পরিধির দিকে থাকে। কোশের ভিতর আড়াআড়ি অনেক রেখা বা ব্যান্ড থাকে, ব্যান্ডগুলি পর্যায়ক্রমে গাঢ় এবং হালকা হয়।

iv. সারকোলেমা স্পষ্ট এবং সম্পূর্ণ। এটি একটি সূক্ষ্ম তন্তুময় ঝিল্লিবিশেষ।

v. অনুপ্রস্থ রেখা স্পষ্ট কিন্তু অনুদৈর্ঘ্য রেখা থাকে। ইন্টারক্যালেটিড ডিস্ক অনুপস্থিত।

vi. পেশি সহজেই অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে এবং নিঃসাড় কাল স্বল্পস্থায়ী।

vii. কিছু সরেখ পেশি কোশ একত্রে অবস্থান করে ফ্যাসিকল সৃষ্টি করে, ফ্যাসিকলগুলির মিলনে সৃষ্টি হয় একটি পেশি।

viii. পেশি তন্তুর আবরণীগুলি হল- এন্ডোমাইসিয়াম, পেরিমাইসিয়াম এবং এপিমাইসিয়াম। সর্বাপেক্ষা ভিতরের আবরণীকে এন্ডোমাইসিয়াম বলে যা একটি বান্ডিলের কয়েকটি তন্তুকে আবৃত করে। মাঝের আবরণীকে পেরিমাইসিয়াম বলে যা কয়েকটি বান্ডিলকে আবৃত করে। একেবারে বাইরের আবরণীটি হল এপিমাইসিয়াম যা সম্পূর্ণ পেশিকে আবৃত করে। প্রতিটি পেশি তন্তু কন্ডরার সঙ্গে যুক্ত থাকে। সারকোপ্লাজমে সারকোটিউবিউল থাকে যা অন্তঃকোশীয় জালকের মতো।

ix. পেশি তন্তুর সাইটোপ্লাজমকে সারকোপ্লাজম বলে। এখানে গ্লাইকোজেন দানা ও মাইটোকন্ড্রিয়া বর্তমান ।

3. হৃদপেশি কাকে বলে :

হৃদযন্ত্রের পেশিকে হৃদপেশি বলে। হৃদপেশি কলাকে মায়োকার্ডিয়াম বলা হয়। এটি বাইরের দিকে এপিকার্ডিয়াম এবং ভিতরের দিকে এন্ডোকার্ডিয়াম দ্বারা আবৃত।

হৃদপেশির বৈশিষ্ট্য :

i. এই পেশির গঠন খানিকটা ঐচ্ছিক পেশির মতো। তবে সারাকোলেমা অস্পষ্ট এবং কোশের মাঝখানে একটি মাত্র নিউক্লিয়াস বর্তমান।

ii. এই পেশির ডোরা দাগগুলি স্পষ্ট নয়, বিন্যাস তির্যকভাবে ও লম্বালম্বিভাবে।

iii. পেশি কোশসমূহ লম্বা ধরনের। এদের শাখাপ্রশাখার দ্বারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে জালিকাকার গঠন তৈরি করে। এর ফলে সকল পেশি কোশকে দেখে মনে হয় একটিই কোশ, এই অবস্থা প্রাপ্তিকে সিনসিটিয়াম নামে অভিহিত করা হয়।

iv. হৃদপেশির মধ্যে ইন্টারক্যালেটেড ডিস্ক দেখা যায় (পেশি কোশের সংযোগস্থলের পর্দা)।

v. পেশিতন্তুর আকার – বেলানাকার, ক্ষুদ্রাকৃতি, লম্বা, শাখা প্রশাখাযুক্ত।

vi. পেশিতন্তুর দৈর্ঘ্য 0.08 mm বা তারও কম এবং প্রস্থে 15 um ।

vii. অনুদৈর্ঘ্য রেখা থাকে এবং অনুপ্রস্থ রেখাও থাকে তবে অস্পষ্ট।

viii. নিঃসাড়কাল দীর্ঘক্ষণ স্থায়ী হয়।

ix. ছন্দময়তা বর্তমান।

x. সহজে অবসাদগ্রস্ত হয় না।

আরও পড়ুন :

আবরণী কলা কাকে বলে ? আবরণী কলার বৈশিষ্ট্য, কাজ ও প্রকারভেদ ? 

যোগ কলা কাকে বলে ? যোগ কলার বৈশিষ্ট্য, গঠন ও কাজ ?

1 thought on “পেশি কলা কাকে বলে ? পেশি কলার বৈশিষ্ট্য, উৎস, উপাদান, কাজ ও প্রকারভেদ”

Leave a Comment