হাইপোথ‍্যালামাস কাকে বলে ? হাইপোথ‍্যালামাসের কাজ | What is Hypothalamus

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

হাইপোথ‍্যালামাস কাকে বলে ? হাইপোথ‍্যালামাসের কাজ | What is Hypothalamus

হাইপোথ‍্যালামাস কাকে বলে : সুপ্রিয় পাঠকগন আমাদের এই নতুন পোষ্টে স্বাগতম , এই পর্বটিতে হাইপোথ‍্যালামাস কাকে বলে এবং হাইপোথ্যালামাসের কাজ সম্পর্কে নিঁখুত ভাবে আলোচনা করেছি, যা আপনাদের জন‍্য খুবই হেল্পফুল হবে। চলুন দেখে নেওয়া যাক হাইপোথ‍্যালামাস কাকে বলে।

হাইপোথ‍্যালামাস কাকে বলে :

মস্তিষ্কের তৃতীয় প্রকোষ্ঠ ও থ্যালামাসের তলদেশে অবস্থিত অগ্রমস্তিষ্কের যে অংশ মানসিক আবেগ, ক্ষুধা, তৃয়া ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে, তাকে হাইপোথ্যালামাস বলে

আন্তরমস্তিষ্কের দুটি প্রধান অংশ হল থ্যালামাস ও হাইপোথ্যালামাস। হাইপোথ্যালামাস তৃতীয় মস্তিষ্ক প্রকোষ্ঠের তলদেশে ও পার্শ্ব প্রাচীরের অপটিক কায়াজমার ঊর্ধ্বাংশ থেকে নীচে ম্যামিলারি বড়ি পর্যন্ত বিস্তৃত থাকে। পৃষ্ঠদেশে এটি থ্যালামাস ও সাব-থ্যালামাসের দ্বারা সীমাবদ্ধ থাকে এবং অঙ্কদেশে পিটুইটারির সঙ্গে যুক্ত হয়।

হাইপোথ্যালামাস শ্বেত পদার্থ ও ধূসর পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। ধূসর পদার্থ বিক্ষিপ্তভাবে হাইপোথ্যালামাসের নিউক্লিয়াস বা স্নায়ুকেন্দ্র গঠন করে। হাইপোথ্যালামাসের নিউক্লিয়াস সমূহ নিম্নলিখিত চারটি অঞ্চলে বিস্তৃত থাকে- 1. প্রিঅপটিক অঞ্চল, 2. সুপ্রাঅপটিক অঞ্চল, 3. টিউবেরাল অঞ্চল এবং 4. ম্যামিলারি অঞ্চল।

হাইপোথ‍্যালামাসের কাজ :

i. স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রণ : হাইপোথ্যালামাস স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের সর্বোচ্চ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এটি স্বতন্ত্র ও পরাস্বতন্ত্র উভয় স্নায়ুতন্ত্রের ক্রিয়াকেই নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। হাইপোথ্যালামাসের পশ্চাদদেশীয় নিউক্লিয়াসসমূহ প্রধানত স্বতন্ত্র স্নায়ুতন্ত্রের কার্যাবলির সঙ্গে জড়িত। এসব নিউক্লিয়াসগুলিকে উদ্দীপিত করলে রক্তচাপ, হৃৎস্পন্দন ও এপিনেফ্রিন ক্ষরণ বেড়ে যায়। তা ছাড়া রক্তবাহের সংকোচন, ও তারারন্দ্রের প্রসারণ এবং ক্ষুদ্রান্ত্রের বিচলন হ্রাস পায়। অপরপক্ষে, হাইপোথ্যালামাসের মধ্যাঞ্চলীয় নিউক্লিয়াসসমূহ পরাস্বতন্ত্র স্নায়ুতন্ত্রের কার্যাবলি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। এসব স্নায়ুকেন্দ্রে উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে তারারম্ভের সংকোচন, রক্তচাপ হ্রাস, হৃৎপিণ্ডের স্পন্দন হারের হ্রাসপ্রাপ্তি ইত্যাদি প্রকাশ পায়।

ii. দেহ উষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ : গবেষণামূলক পর্যবেক্ষণে হাইপোথ্যালামাসে দুটি দেহউয়তা নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রের উপস্থিতি লক্ষ করা গেছে। এর একটি হাইপোথ্যালামাসের সম্মুখভাগে ও অপরটি পশ্চাদভাগে অবস্থিত। এই দুটি উন্নতা নিয়ন্ত্রক কেন্দ্রের মাধ্যমে হাইপোথ্যালামাস থার্মোস্ট্যাটরূপে কাজ করে দেহউষ্ণতা নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। যেমন- পরিবেশের উচ্চতা বৃদ্ধিতে হাইপোথ্যালামাসের সম্মুখভাগের নিউক্লিয়াসসমূহ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাহপ্রসারণ ও স্বেদক্ষরণের মাধ্যমে দেহের তাপক্ষয় বৃদ্ধি করে। অপরপক্ষে, ঠান্ডা আবহাওয়ায় হাইপোথ্যালামাসের পশ্চাদভাগের নিউক্লিয়াসসমূহ সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং বাহ সংকোচন এবং স্বেদক্ষরণের বিলোপ প্রভৃতি প্রক্রিয়ার মাধ্যমে দেহের তাপক্ষয় রোধ করে।

iii. মানসিক আবেগ নিয়ন্ত্রণ : হাইপোথ্যালামাস হাসি, কান্না, ভয়, ক্রোধ, উত্তেজনা, উদবেগ ইত্যাদি মানসিক আবেগের নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। দেখা গেছে যে, হাইপোথ্যালামাসের সম্মুখ অংশকে উদ্দীপিত করলে। প্রাণীদেহে মানসিক উত্তেজনার বহিঃপ্রকাশ ঘটে। তা ছাড়া হাইপোথ্যালামাসের অঙ্কীয় অঞ্চল বা স্নায়ুকেন্দ্রসমূহকে বিনষ্ট করলে প্রাণী ক্ষিপ্ত ও হিংস্র হয়ে ওঠে এবং পর্যবেক্ষককে আক্রমণ করতে উদ্যত হয়। হাইপোথ্যালামাসে ক্ষত সৃষ্টি হলে অট্টহাসি, উচ্চস্বরে কান্না, কৃত্রিম রোধ প্রভৃতি আবেগময় পরিবর্তনের বহিঃপ্রকাশ। ঘটে, এর সঙ্গে অন্যান্য ত্রুটি-বিচ্যুতিও প্রকট হয়ে ওঠে।

iv. ক্ষুধা, তৃষ্ণা, খাদ্যগ্রহণ, পরিতৃপ্তি ও স্থূলতা : হাইপোথ্যালামাসের অঙ্কমধ্যস্থ নিউক্লিয়াসের পার্শ্বদেশ ভোজনকেন্দ্র হিসেবে কাজ করে। এই অংশে উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে প্রাণীয় খাদ্যগ্রহণ যেমন বৃদ্ধি পায়, তেমনি একে বিনষ্ট করলে খাদ্যগ্রহণ স্পৃহা সম্পূর্ণ লোপ পায়। আবার হাইপোথ্যালামাসের অক্রমধ্যস্থ নিউক্লিয়াসের মধ্য অংশ ‘পরিতৃপ্তি কেন্দ্র হিসাবে কাজ করে। অর্থাৎ এই অংশ বিনষ্ট হলে খাদ্য স্পৃহা বৃদ্ধি পায় প্রাণীস্থূল হয়ে পড়ে এবং উদ্দীপনা প্রয়োগ করলে খাদ্য স্পৃহা সম্পূর্ণ লোপ পায়। হাইপোথ্যালামাসে একটি তৃয়াকেন্দ্র আছে। ইঁদুরের প্যারাভেন্ট্রিকুলার নিউক্লিয়াসের সন্নিকটস্থ নিউক্লিয়াস সমূহে অতিসারক তরল প্রবেশ করলে প্রাণীর তৃষ্ণা বেড়ে যায়।

v. যৌনক্রিয়া : প্রাণীর যৌন আচরণে হাইপোথ্যালামাস প্রভাব বিস্তার করে। যৌনোত্তাপ সম্পন্ন বিড়ালে হাইপোথ্যালামাসের অঙ্কীয় স্নায়ুকেন্দ্রসমূহের উদ্দীপনায় ডিম্বাণু নিঃসরণ ঘটে। হাইপোথ্যালামাসের সম্মুখভাগের উভয় পার্শ্বে ক্ষত সৃষ্টি করলে স্ত্রী ইঁদুর ও গিনিপিগে অবিচ্ছিন্ন যৌনোত্তাপকাল চলতে থাকে এবং পুং ইঁদুরে শুক্রাণু উৎপাদন ব্যাহত হয় ও শুক্রাশয় ক্ষয়িষ্ণু হয়ে পড়ে।

vi. পিটুইটারির অগ্রখণ্ড সংশ্লিষ্ট কাজ : হাইপোথ্যালামাস কতকগুলি রিলিজিং হরমোন দ্বারা পিটুইটারির অগ্রখন্ড থেকে হরমোন ক্ষরণ নিয়ন্ত্রণ করে। যেমন-কটিকোট্রপিক রিলিজিং হরমোন হাইপোথ্যালামাস থেকে নিঃসৃত হয় এবং এটি পিটুইটারির অগ্রখণ্ড থেকে অ্যাড্রিনোকটিকোট্রপিক হরমোনের ক্ষরণ ঘটায়।

vii. পাকস্থলীর অ্যাসিড ক্ষরণ : পাকস্থলীর অ্যাসিড ক্ষরণে হাইপোথ্যালামাসের প্রভাব সর্বজনগ্রাহ্য। আবেগজনিত কারণে
হাইপোথ্যালামাসের অতিসক্রিয়তার ফলে পাকস্থলী অ্যাসিড বেশি মাত্রায় ক্ষরিত হয় এবং এইজন্য পাকস্থলীতে ক্ষত সৃষ্টি হয়।

viii. হৃদ-রক্তবাহসংক্রান্ত কাজ নিয়ন্ত্রণ : স্বয়ংক্রিয় স্নায়ুতন্ত্রের নিয়ন্ত্রক হিসেবে হাইপোথ্যালামাস হৎস্পন্দন হার, রক্তচাপ ইত্যাদি নিয়ন্ত্রণ করে থাকে। তা ছাড়া ক্রোধ, ভয়, রাগ ইত্যাদিতে দেহের স্থিতাবস্থা হাইপোথ্যালামাসের দ্বারা বজায় থাকে।

ix. কার্বোহাইড্রেট ও স্নেহপদার্থের বিপাক : হাইপোথ্যালামাস কার্বোহাইড্রেট ও স্নেহপদার্থের বিপাক নিয়ন্ত্রণ করে। হাইপোথ্যালামাসে ক্ষত সৃষ্টি হলে মৌল বিপাকীয় হার হ্রাস পায়, গ্লুকোজ সহিঞ্চুতার বৃদ্ধি ঘটে, স্নেহপদার্থের সভায় বৃদ্ধি পায় এবং বহুমূত্র রোগ দেখা দেয়।

x. নিদ্রা : হাইপাথ্যালামাসকে বিনষ্ট করলে প্রাণীর ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। হাইপোথ্যালামাসের পশ্চাদদেশীয় স্নায়ুকেন্দ্রে উদ্দীপনা প্রয়োগ করে দেখা গেছে, প্রাণী দীর্ঘক্ষণ তন্দ্রাচ্ছন্ন হয়ে থাকে। তা ছাড়া ঊর্ধ্ব ম্যামিলারি অঞ্চলে ক্ষত সৃষ্টি হলে প্রাণীর ঐচ্ছিক চলাফেরার বিলোপ ঘটে এবং প্রাণী তন্দ্রালু হয়ে পড়ে।

আরও পড়ুন :

গুরুমস্তিষ্ক কাকে বলে ? গুরুমস্তিস্কের গঠন ও কাজ ?

থ‍্যালামাস কাকে বলে ? থ‍্যালামাসের গ্ৰুপ ও কাজ ? 

Leave a Comment