ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি, কারণ, ফলাফল,দার্শনিকদের ভূমিকা

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

সুপ্রিয় বন্ধুরা,                                  আজকে তোমাদের সঙ্গে শেয়ার করছি, ফরাসি বিপ্লবের ভূমিকা, পটভূমি, কারণ, ফলাফল, ও বিভিন্ন দার্শনিকের ভূমিকা সম্পর্কে।

ফরাসি বিপ্লব : ভূমিকা, পটভূমি, কারণ, ফলাফল,দার্শনিকদের ভূমিকা এবং অন‍্যান‍্য বিবরণ

ফরাসি বিপ্লবের ভূমিকা :

আধুনিক বিশ্বের রাষ্ট্রব্যবস্থার কতগুলি প্রধান বৈশিষ্ট্য লক্ষ্য করা যায় যেমন গণতান্ত্রিক ধর্মাচরণের স্বাধীনতা বা আইনের চোখে সমান অধিকার প্রভৃতি। এই অধিকার গুলি কিন্তু মাত্র আড়াইশো বছর পূর্বেও পৃথিবীর অধিকাংশ মানুষের হাতের বাইরে ছিল। যে ঘটনার মধ্য দিয়ে ইউরোপের মূল ভূখণ্ডের মানুষ প্রথম এই অধিকার গুলির স্বাদ গ্রহণ করেছিল তা হল ১৭৯৯ খ্রিস্টাব্দের ফরাসি বিপ্লব

বিপ্লব ফ্রান্সে শুরু হলেও তা শীঘ্রই সমগ্র ইউরোপকে প্রভাবিত করেছিল। জর্জ লেফেভর এর মত অনুসারে, অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষের দিকে ফরাসি বিপ্লবই ছিল আধুনিক সভ্যতার বৃহত্তর পথের বাঁক। দীর্ঘকাল ধরে এই বিপ্লবের প্রেক্ষাপট তৈরি হয়েছিল।

ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি :

ফরাসি বিপ্লবের পটভূমির সন্ধান করতে গিয়ে ঐতিহাসিক জর্জ লেফেভর মন্তব্য করেন, ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি অনুসন্ধান করতে হবে তার অতীতের ইতিহাস থেকে। ১৭৮৯ এ সৃষ্ট এই বিপ্লব ইউরোপের ইতিহাসে এক যুগান্তকারী ঘটনার রূপে চিহ্নিত হয়েছিল।

অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ দিকে ফ্রান্সের রাজতন্ত্রকে এক জটিল পরিস্থিতি ও অর্থনৈতিক সংকটের ব্যাপক অসন্তোষের কারণেই ইউরোপের বুকে সংগঠিত হয়েছিল এই বিপ্লব।

ফরাসি বিপ্লবের কারণ গুলি কি কি :

ফরাসি বিপ্লবের কারণ গুলির মধ্যে অন্যতম প্রধান তিনটি কারণ ছিল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, ও সামাজিক কারণ।

ফরাসি বিপ্লবের রাজনৈতিক কারণ :

স্বৈরাচারী রাজতন্ত্র : এই বিপ্লবের রাজতন্ত্র ছিল স্বৈরাচারী ও কেন্দ্রীভূত। ফরাসি সম্রাট ক্রায়োদশ লুই ও তার মন্ত্রী কার্ডিনাল রিশল‍্যুর আমলে যে স্বৈরাচারী রাজতন্ত্রের উদ্ভব হয়েছিল তা মূলত অষ্টদশ শতাব্দীতে ষোড়শ লুইয়ের শাসনকালে  অপ্রতিহত ক্ষমতার অধিকারী হয়ে ওঠে ।

ষোড়শ লুই একজন দুর্বল শাসক থাকার কারণে তিনি সিংহাসনে আরোহন করার পর আরও সমস্যা হয়ে ওঠে। এর কারণেই রাজপ্রতিনিধি ইন্টেন্ডেন্টেদের সীমাহীন ক্ষমতা ত্বরান্বিত হয়েছিল। যার ফলস্বরূপ সাধারণ মানুষ তাদের অর্থলোলুপ নেকড়ে নামে অভিহিত করেছিল।

আইন ব্যবস্থা : এই সময় ফ্রান্সের আইন বিধিও ছিল ত্রুটিপূর্ণ। সমগ্র দেশের জন্য কোন বিধিবদ্ধ আইন দেখা যায়নি। বিভিন্ন প্রদেশের ভিন্ন ভিন্ন আইন ও বিচার ব্যবস্থা প্রচলিত ছিল। অনেক সময় রাজার আদেশ বা অনুশাসন আইনি হিসেবেই গণ্য করা হত।

বিচার ব্যবস্থা : এই সময় এক প্রকার দুর্নীতিগ্রস্ত। আবার লেএ-দ‍্য-ক‍্যাশে নামক গ্রেফতারি পরোয়ানা দ্বারা যেকোনো ব্যক্তিকে গ্রেফতার করা যেত। আবার লেএ দ‍্য গ্ৰেস গাড়ির মাধ্যমে অভিযুক্ত যে কোন ব্যক্তিকে ছেড়ে দেওয়া হত।

ফরাসি বিপ্লবের অর্থনৈতিক কারণ :

কেবল রাজনৈতিক কারণই নয় অর্থনৈতিক কারণও নিরশনে সরকারের ব্যর্থতাও বিপ্লবকে অনিবার্য করে তুলেছিল। প্রশাসনিক ব‍্যয় অত্যাধিক মাত্রায় ছাড়িয়েছিল। এই ধরনের অর্থনৈতিক সংকটের পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাডাম স্মিথ তার তার বিখ্যাত বিখ্যাত গ্রন্থ ওয়েলথ অফ নেশনস -এ ভ্রান্ত অর্থনীতির জাদুঘর হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।

করব্যবস্থা : ফরাশি রাষ্ট্রের কর ব্যবস্থা ছিল ভ্রান্ত। যাজক ও অভিজাতকদের তদারূপ কোন কর দিতে হতো না কিন্তু এরাই ছিল সর্বাধিক সুবিধাভোগী শ্রেণীর মানুষ। এক সময় দেখা যায় জনগণের ক্রয় ক্ষমতা হ্রাস পাওয়ার সাথে সাথে সরকারি আয়ও কমে যায় । সুতরাং ঘাটতিপূরণের একমাত্র উপায় ছিল সুবিধাভোগী শ্রেণীর রাজস্ব সংক্রান্ত সুযোগ-সুবিধা বিলোপ করা।

অর্থনৈতিক সংস্কারের ভিতর দিয়ে এই কাজটি করার চেষ্টা করেন রাজা ষোড়শ লুই। কিন্তু নিজেদের সুযোগসুবিধা বজায় রাখার জন্য অভিজাতরা তীব্র আন্দোলনে লিপ্ত হয়। এই আন্দোলনকে কোন কোন ঐতিহাসিক অভিজাত বিদ্রোহ বলেছেন।

করভি: সামন্ততান্ত্রিক আইন অনুসারে সামন্তপ্রভু অনেক প্রকার ভেট পাওয়ার অধিকারী ছিলেন। সামন্ততান্ত্রিক রীতি অনুসারে তিনি সামাজিক সম্মান লাভের পাশাপাশি কৃষকদের দিয়ে নানা পোকার কাজ করিয়ে নিতো যেমন গম ভাঙানো, খাদ্য প্রস্তুত, রাস্তাঘাট নির্মাণ, দুর্গ নির্মাণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে বিনা পারিশ্রমিকে বাধ্যতামূলক শ্রম দিতে বাধ্য করা হতো কৃষকদের।

ফরাসি বিপ্লবের সামাজিক কারণ :

বিপ্লব পূর্ববর্তী ফরাসি সমাজ ভিন্ন ভিন্ন তিনটে সম্প্রদায়ে বিভক্ত ছিল। যাজক, অভিজাত এবং এই দুই শ্রেণী ছাড়াও অন্যান্য ফরাসি জনগণ।

প্রথম সম্প্রদায় : ফ্রান্সের প্রথম সম্প্রদায় বা যাজকরা ছিলেন অধিক সুবিধাভোগী শ্রেণীর মানুষ। এদের কোন উপকার কর দিতে হতো না। সমগ্র জনসংখ্যার 1% ছিল যাজক শ্রেণী, এদের দুটি ভাগ ছিল উচ্চ যাজক সম্প্রদায় নিম্ন যাজক সম্প্রদায়।

দ্বিতীয় সম্প্রদায় : রাজা বা রানির আত্মীয়পরিস্বজন এবং উচ্চ বংশীয় ব্যক্তিরা অভিজাত হিসেবে গণ্য হত। অভিজাতরা ছিলেন সুবিধাভোগী শ্রেণীর মানুষ এদের সংখ্যা ছিল 3-4 লক্ষ মত।

তৃতীয় সম্প্রদায় : উপরের ক্ষমতাবান দুই সম্প্রদায় ছাড়া অন্যান্য জনসাধারণ ছিল ক্ষমতাহীন। এদের অন্তর্গত ছিল বুর্জোয়া, কৃষক, শ্রমজীবী মানুষ। দেশের মোট জনসংখ্যার ৬৭% ছিল কৃষিজীবি। ফরাসি সম্প্রদায়ের শ্রমজীবী সম্প্রদায়ের অন্তর্গত ছিল দিনমজুর, কানখানা শ্রমিক, কারিগর, মালি, কাঠুরে, রাজমিস্ত্রি,জেলে প্রভৃতি।

ফরাসি বিপ্লবের ফলাফল কি ছিল :

1. ফরাসি বিপ্লবের ফলে ফ্রান্সের সমাজ ব্যবস্থা রাজনৈতিক ব্যবস্থা শিক্ষা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে ব্যাপক পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়।

2. ফ্রান্সে সামন্ততান্ত্রিক ধারার পরিবর্তে পুঁজিবাতি ধারায় রূপ নেই।

3.নিরঙ্কুশ রাজতন্ত্র, অভিজাতন্ত্র, এবং ধর্মযাজক গোষ্ঠীর প্রভাব লোপ পেতে থাকে।

4. ফরাসি বিপ্লব শুধু ফ্রান্সের সমাজকেই নয় ইউরোপকেউ আলোর দিশা দেখিয়েছিল।

5. এই বিপ্লবের ফলে সমগ্র দেশে মৌলিক ও মানবঅধিকার স্বীকৃতি পায়।

6. সামন্তপ্রথা বিলোপের ফলে ফ্রান্সে স্বাধীন বুর্জোয়া কৃষক শ্রেণীর উদ্ভব হয়।

7. সামন্তপ্রথা বিলোপের ফলে ফ্রান্সে পুঁজিবাদ বিকশিত হতে থাকে।

ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকা :

সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক প্রায় সকল ক্ষেত্রেই ফরাসি জাতির মধ্যে একপ্রকার ক্ষোভের জন্ম নিয়েছিল। তবে বিপ্লবের জন্য মানসিক প্রস্তুত বা বিপ্লবের মনস্কতার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে । এক্ষেত্রে ফরাসি বিপ্লবে দার্শনিকদের ভূমিকা ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এদের মধ্যে প্রথম সারিতে ছিলেন ভলতেয়ার, মন্তেস্কু, রুশো প্রমুখ।

দার্শনিক ভলতেয়ারের ভূমিকা :

ভলতেয়ার ছিলেন একজন সাহিত্যিক প্রবন্ধকার, সাংবাদিক এবং দার্শনিক। তার বিখ্যাত গ্রন্থের মধ্যে অন্যতম হলো লেতর ফিলজফিক এবং কাঁদিদ। স্লেশাত্মক রচনার মাধ্যমে চর্চা ও যাজকদের দুর্নীতি ও অনাচার সম্বন্ধে তিনি সাধারণ মানুষকে অভিহিত করেন। তিনি ব্যক্তিস্বাধীনতার অধিকারকে খর্ব করার বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

দার্শনিক রুশোর ভূমিকা :

অষ্টাদশ শতাব্দীর সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ও জনপ্রিয় লেখকদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন জাঁঁ জেকুইস রুশো । রুশো মনে করতেন মানুষ স্বাধীন সত্তা নিয়ে জন্মগ্রহণ করে। তার বিখ্যাত গ্রন্থ Social Contract বা সামাজিক চুক্তি এই গ্রন্থে তিনি বলেন যে আদিম যুগে মানুষ এক অলিখিত চুক্তির দ্বারা ব্যাক্তিবিশেষকে শাসক পদ দান করেছে।

রুশোর অপরএকটি বিখ্যাত গ্রন্থ Discourse on the Origin Of Inequality বা অসাম্যের সূত্রপাত এই গ্রন্থে দেখিয়েছেন মানুষ সমান অধিকার নিয়ে জন্মগ্রহণ করে কিন্তু লোভী ও স্বার্থপর সমাজ ব্যবস্থার কারণে সে প্রতি পদে বঞ্চিত হয়।

দার্শনিক মন্তেস্কুর ভূমিকা :

মন্তেস্কু ইংল্যান্ডের মুক্ত সমাজ ব্যবস্থার অনুকরণে ফ্রান্সে সমাজ সংস্কার চেয়েছিলেন। তিনি ক্যাথলিক চর্চাকে ‘a priviledged nuisance’s বলে অভিহিত করেন। তার আলোচনার মূল বিষয়বস্তু ছিল প্রধানত সাংবাদিক সমস্যাসমূহ। মন্তেস্কু মনে করেছিলেন শাসন, আইন ও বিচারবিভাগ একই ব্যক্তি অথবা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকলে তা স্বৈরাচারী হয়ে ওঠার প্রবণতা বাড়ে।

1747 খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত দি স্পিরিট অফ লজ গ্রন্থে তিনি ক্ষমতা বিভাজনের তত্ত্ব তুলে ধরেছিলেন। এই তথ্য অনুসারে আইন, বিচার ও শাসনবিভাগ পৃথক পৃথক ব্যাক্তি বা প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণে থাকা বাঞ্ছনীয়।

উপসংহার : ফরাসি বিপ্লব সংঘটিত হওয়ার নৈপত্রে দার্শনিকদের ভূমিকা সম্পর্কে বিভিন্ন পণ্ডিতদের মধ্যে বিভিন্ন মতভেদ আছে। অলওয়েন হাফটন, সাইমন, শামা প্রমুখ মনে করেন দার্শনিক ভাবধারায় উদ্বুদ্ধ হয়ে ফরাসি বুদ্ধিজীবীরা গণমুখী, নাটক, সাহিত্য, চিত্রকলা সৃষ্টি করেছিলেন।

আরও পড়ুন :

রুশ বিপ্লব কি ? রুশ বিপ্লবের কারণ ?

গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন : 

1. ফরাসি বিপ্লবের জননী বলা হয় কাকে ?

উ: ফ্রান্সের প্যারিস শহরকে

2. ফরাসি বিপ্লবের মূলমন্ত্র ছিল কোনটি ?

উ: স্বাধীনতা, সাম্য ও মৈত্রী

3. ফরাসি বিপ্লব কবে হয়েছিল ?

উ: 1789 সালে 5 ই মে

4. ফরাসি বিপ্লবের জনক কাকে বলা হয় ?

জাঁ জেকুইস রুশো কে।

5. ফরাসি বিপ্লবের সময় ফ্রান্সের রাজা রূপে নিযুক্ত ছিলেন কে ?

উ: ষোড়শ লুই

3 thoughts on “ফরাসি বিপ্লবের পটভূমি, কারণ, ফলাফল,দার্শনিকদের ভূমিকা”

Leave a Comment