সনদ আইন বা চ‍্যার্টার অ্যাক্ট

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

সনদ আইন বা চ‍্যার্টার অ্যাক্ট আইন

সনদ আইন বা চ‍্যার্টার অ্যাক্ট : আজকের এই পর্বটিতে বিভিন্ন সনদ আইন বা চ‍্যার্টার অ্যাক্ট সম্পর্কে আলোচনা করা হল‌। চলুন দেখে নেওয়া যাক বিস্তৃত আলোচনাটি।

সনদ আইন কি :

1783 সালের রেগুলেটিং আইনে ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে প্রাচ্যদেশে বাণিজ্য করার জন্য সরকারের কাছ থেকে নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে অনুমোদন বা ‘ সনদ ’ নেওয়ার কথা বলা হয় । এই আইনে কোম্পানিকে পরবর্তী 20 বছরের জন্য বাণিজ্যের অধিকার বা সনদ দেওয়া হয় । 1793 সালে এই সনদের মেয়াদ শেষ হলে তখন থেকে কোম্পানির সনদের মেয়াদ প্রতি 20 বছর অন্তর মোট 4 বার বৃদ্ধি করা হয়। এই উপলক্ষ্যে ব্রিটিশ সরকার 1793 , 1813 , 1833 ও 1853 সালে পৃথক চারটি চার্টার অ্যাক্ট পাস করে। আইনগুলি সম্পর্কে নীচে সেগুলির বিস্তৃত আলোচনা করা হল-

1793 সালের সনদ আইন :

ব্রিটিশ পার্লামেন্ট 1793 খ্রিস্টাব্দে প্রথম চার্টার অ্যাক্ট পাস করে।

শর্তাবলি :

1793 সালের সনদ আইনের শর্ত গুলি হল-

i. ভারতে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের মেয়াদ 20 বছর বাড়ানো হয়।

ii. বোর্ড অব কন্ট্রোলের সদস্য সংখ্যা 6 থেকে কমিয়ে 5 জন করা হয়।

iii. ভারতীয় রাজস্ব থেকে এই সদস্যদের বেতন ও ভাতা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়।

iv. বোম্বাই ও মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সের ওপর গভর্নর – জেনারেলের কর্তৃত্ব আরও বাড়ানো হয়।

v. কোম্পানির কর্মচারীদের শূন্যপদগুলিতে নিয়োগের ক্ষেত্রে ভারতে অন্তত 3 বছর বসবাসকারী অভিজ্ঞ ইংরেজদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়।

ফলাফল :

এই আইনে গভর্নর – জেনারেলের ক্ষমতা বৃদ্ধি হলেও শাসন – সংক্রান্ত বিষয়ে খুব বেশি পরিবর্তন ঘটেনি।

1813 সালের সনদ আইন :

1793 খ্রিস্টাব্দের চার্টার অ্যাক্ট প্রণীত কোম্পানির সনদের মেয়াদ 1813 খ্রিস্টাব্দে শেষ হলে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট 1813 খ্রিস্টাব্দে দ্বিতীয় চার্টার অ্যাক্ট পাস করে।

শর্তাবলি :

1813 সালের সনদ আইনের শর্ত গুলি হল-

i. ভারতে কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অধিকার লোপ করা হয়।

ii. ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ওপর ব্রিটিশ – রাজের সার্বভৌমত্ব ঘোষিত হয়।

iii. কোম্পানি আরও 20 বছরের জন্য ভারতে শাসন পরিচালনার অধিকার পায়।

iv.কোম্পানির আদায় করা রাজস্ব থেকে বার্ষিক ১ লক্ষ টাকা ভারতীয়দের সাহিত্য ও বিজ্ঞান শিক্ষার জন্য ব্যয় করার কথা বলা হয়।

v. কোম্পানির সামরিক ও বেসামরিক পদে নিযুক্ত হওয়ার জন্য যথাক্রমে এডিসকোম ও হেইলেবেরি কলেজ থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়।

1813 সালের সনদ আইনের ফলাফল :

i. কোম্পানির একচেটিয়া বাণিজ্যের অবসানের ফলে সকল ব্রিটিশ বণিকরা ভারতে ব্যাবসা করার সুযোগ পায় ।

Ii. ভারতীয় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যে ব্রিটিশ সরকারের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার ইঙ্গিত দেওয়া হয়।

iii. কোম্পানিকে একটি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান থেকে রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।

Iv. যোগ্যতার ভিত্তিতে সরকারি কর্মচারী নিয়োগে গুরুত্ব দেওয়া হয়।

1833 সালের সনদ আইন :

কোম্পানির সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবীকরণের উদ্দেশ্যে 1833 খ্রিস্টাব্দে তৃতীয় চার্টার অ্যাক্ট পাস করা হয়।

শর্তাবলি :

1833 সালের সনদ আইনের শর্ত গুলি হল-

i. ভারতে কোম্পানি আরও 20 বছর শাসন পরিচালনা করবে।

ii. কোম্পানির যাবতীয় আর্থিক দায় ও ঋণ ভারতের রাজস্ব থেকে পরিশোধ করতে হবে।

iii. বোর্ড অব কন্ট্রোলের সভাপতি ‘ ভারত বিষয়ক মন্ত্রী হিসেবে ব্রিটিশ মন্ত্রীসভায় স্থান পাবেন।

iv. বাংলার গভর্নর জেনারেল এখন থেকে ভারতের গভর্নর – জেনারেল ‘ বলে বিবেচিত হবেন। এই আইন অনুসারে , লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক ভারতের প্রথম গভর্নর – জেনারেল হিসেবে নিযুক্ত হন।

v. কোম্পানির কর্মচারীরা ভারতে জমি ক্রয়বিক্রয়ের অধিকার পান।

1833 সালের সনদ আইনের ফলাফল :

i. গভর্নর জেনারেলের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে ভারতে শক্তিশালী কেন্দ্রীয় শাসন প্রতিষ্ঠার পথ প্রস্তুত করা হয়।

ii. গভর্নর – জেনারেলের নেতৃত্বে সারাদেশে একই ধরনের আইন প্রবর্তনের পথ প্রস্তুত হয় । মার্শম্যান মন্তব্য করেছেন যে , এই আইন ছিল ‘ কোম্পানির প্রশাসনিক দক্ষতাবৃদ্ধির সুচিন্তিত পদক্ষেপ ‘।

1853 সালের সনদ আইন :

কোম্পানির সনদের মেয়াদ শেষ হওয়ার পর তা নবীকরণের উদ্দেশ্যে 1853 খ্রিস্টাব্দের চার্টার অ্যাক্ট পাস করা হয়।

শর্তাবলি :

1853 সালের সনদ আইনের শর্ত গুলি হল-

i. ভারতে কোম্পানি শাসন পরিচালনার অধিকার বজায় রাখলেও এতে কোনো মেয়াদ উল্লেখ করা হয়নি।

Ii. অবাধ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে কোম্পানির আমলাদের নিয়োগের সিদ্ধান্ত হয়।

iii. আইন প্রণয়নের উদ্দেশ্যে বড়োলাটের অধীনে 12 সদস্যবিশিষ্ট আইন পরিষদ গঠিত হয়।

iv. যে – কোনো আইন প্রবর্তনে গভর্নর – জেনারেলের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হয়।

v. ভারতে আইন বিষয়ক পরামর্শ দানের উদ্দেশ্যে ইংল্যান্ডে ‘ আইন কমিশন ‘ গঠিত হয়।

1853 সনদ আইনের ফলাফল :

I. ভারতে কোম্পানির শাসন পরিচালনার কোনো সময়সীমা ধার্য না হওয়ায় বোঝা যায় যে , কোম্পানির হাত থেকে ভারতের শাসনক্ষমতা শীঘ্রই অধিগ্রহণ করা হবে।

ii. বড়োলাটের আইন পরিষদে শাসন বিভাগ থেকে আইন বিভাগকে পৃথক করে এদেশে সংসদীয় শাসনব্যবস্থার সূত্রপাত ঘটানো হয়।

আরও পড়ুন : 

বক্সারের যুদ্ধের কারণ ও ফলাফল 

1 thought on “সনদ আইন বা চ‍্যার্টার অ্যাক্ট”

Leave a Comment