বুদ্ধি কাকে বলে ? বুদ্ধির শ্রেণীবিভাগ , কাজ ও বৈশিষ্ট্য

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

বুদ্ধি কাকে বলে ? বুদ্ধির শ্রেণীবিভাগ , কাজ ও বৈশিষ্ট্য

বুদ্ধি কাকে বলে : আজকে আমরা এই পর্বটিতে আলোচনা করব বুদ্ধি কাকে বলে? বুদ্ধির শ্রেণীবিভাগ ? বুদ্ধির কাজ এবং বুদ্ধির বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে।চলুন দেখে নেওয়া যাক বুদ্ধি কাকে বলে তারই বিস্তারিত আলোচনাটি।

বুদ্ধি কাকে বলে :

বুদ্ধি শিখনের ক্ষেত্রে যে সকল উপাদান বিশেষভাবে সহায়ক হয় সেগুলির মধ্যে একটি হল বুদ্ধি। আভিধানিক অর্থে বুদ্ধি বলতে বোঝায় “ The Capacity To Acquire And Apply Knowledge ‘ অর্থাৎ জ্ঞান অর্জন ও প্রয়োগ করার ক্ষমতা হল বুদ্ধি। বিভিন্ন মনোবিজ্ঞানীদের মতে বুদ্ধি হল একটি মানসিক সামর্থ্য।

বিভিন্ন মনোবিদ বিভিন্নভাবে বুদ্ধির সংজ্ঞা নিরূপণ করেছেন বুদ্ধির সংজ্ঞাগুলিকে মূলত চারটি শ্রেণিতে ভাগ করা যায়। এখানে প্রতিটি শ্রেণির কয়েকটি সংজ্ঞা প্রদান করা হল-

বুদ্ধির সংজ্ঞা :

1. জীববিদ‍্যাগত সংজ্ঞা :

মনোবিদ স্টার্নের মতানুসারে, জীবনের নতুন সমস্যা বা পরিস্থিতির সঙ্গে সার্থকভাবে মানিয়ে নেওয়ার সাধারণ ক্ষমতার প্রক্রিয়ায় হল বুদ্ধি।

মনোবিদ প‍্যাটারসনের মতানুসারে, যে জৈবিক কৌশলের সাহায্যে কোন জটিল উদ্দীপক পরিস্থিতির মধ্যে সমন্বয়সাধন করে কোন ব্যক্তি একক প্রতিক্রিয়া করতে পারে তাকেই বলা হয় বুদ্ধি।

2. শিক্ষাবিজ্ঞানগত সংজ্ঞা :

মনোবিদ বাকিংহাম এর মতানুসারে, শিখনের ক্ষমতায় হল বুদ্ধি।

3. মানসিক ক্ষমতা বিষয়ক সংজ্ঞা :

পিরোঁর মতানুসারে, বুদ্ধি হল একটি মূল্য নিরপেক্ষ আচরণ।

4. পরীক্ষনির্ভর সংজ্ঞা :

থাস্টোনের মতানুসারে, বুদ্ধি হল প্রচেষ্টা ও ভুলের মাধ্যমে জীবন যাপনের ক্ষমতা।

বাটের মতানুসারে, যে কোন ব্যক্তির জৈব মানসিক সংগঠনের মধ্যে পুনর্ববিন্যাস করে অপেক্ষাকৃত নতুন পরিস্থিতির মোকাবিলার ক্ষমতায় হল বুদ্ধি।

বিভিন্ন মনোবিদের দেওয়া বুদ্ধির সংজ্ঞাগুলিকে একত্রিত করে বলা যায়“ বুদ্ধি হল এমন এক ধরনের মানসিক শক্তি যার সাহায্যে কোনো ব্যক্তি সূক্ষ্ম- জটিল ও বিমূর্ত বিষয় নিয়ে চিন্তাশীল হয়। অল্প সময়ের মধ্যে বিভিন্ন সমস্যার সমাধানের মাধ্যমে নতুন পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে পারে। বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান, দক্ষতা ও কৌশল আয়ত্ত করতে পারে। এ ছাড়া পূর্বে অর্জিত অভিজ্ঞতার বা জ্ঞানের সাহায্যে নতুন পরিস্থিতির ব্যাখ্যা করতে পারে।

বুদ্ধির শ্রেণীবিভাগ :

মনোবিদ থনডাইকের মতানুসারে বুদ্ধিকে চারটে ভাগে ভাগ করা হয় যথা সেগুলি হল-

1. মূর্ত বুদ্ধি : হাতে কলমে কাজের ক্ষেত্রে মূর্ত বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। কোনো কিছু নির্দিষ্ট ভাবে বিন্যস্ত করা যন্ত্রের বিভিন্ন অংশ জোড়া লাগানো ইত্যাদি ক্ষেত্রে এই বুদ্ধির প্রয়োগ করা হয়ে থাকে।

2. বিমূর্ত বুদ্ধি : ভাষার ব্যবহার, সংখ্যার ব্যবহার, চিন্তা, কল্পনা, যুক্তি নির্ণয় ইত্যাদির ক্ষেত্রে এই বুদ্ধির প্রয়োজন হয় গাণিতিক সমস্যার সমাধান, সাহিত্যের বিশ্লেষণ ইত্যাদি বিষয়ে বুদ্ধির প্রয়োগ করা হয়।

3. প্রাক্ষোভিক বুদ্ধি : প্রাক্ষোভিক আচরণের ক্ষেত্রে এই বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। বাঞ্ছিত প্রক্ষোভের ব্যবহার এবং অবাঞ্ছিত প্রক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে এই বুদ্ধির প্রয়োগ ব্যাপকভাবে ঘটে।

4. সামাজিক বুদ্ধ : দৈনন্দিন জীবনের সামাজিক পরিবেশে যথাযথ প্রতিক্রিয়া দিতে এই বুদ্ধির প্রয়োজন হয়। সকলের সঙ্গে মিলেমিশে কাজ করার ক্ষেত্রে এই বুদ্ধি বিশেষ সহায়ক হয়।

বুদ্ধির কাজ :

বুদ্ধির গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলি নিম্ন আলোচনা করা হল-

1. শিক্ষাগ্ৰহণে সহায়ক : বুদ্ধি অতীত অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা গ্রহণে সহায়ক হয়।

2. সম্বন্ধ নির্ণয় : বুদ্ধি বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে সম্বন্ধ নির্ণয় করতে বিশেষ ভূমিকা পালন করে।

3. সংগতি বিধান : বুদ্ধি নতুন পরিবেশের সঙ্গে সংগতি বিধান করতে পারে।

4. সমস্যা সমাধান : বুদ্ধি যেকোনো সমস্যার গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে শিক্ষা নিয়ে অপরূপ সমস্যার সমাধান করতে পারে।

পড়ুন : স্মৃতি কি ?

বুদ্ধির বৈশিষ্ট্য :

বুদ্ধি হল একপ্রকার মানসিক শক্তি যার বহিঃপ্রকাশ বিভিন্ন প্রকার আচরণের মধ্য দিয়ে ঘটে। বুদ্ধির কতগুলি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য নিম্ন আলোচনা করা হল-

1. পূর্ব অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে শিখনে সহায়তা : বুদ্ধি হল এমনই এক মানসিক সামর্থ্য যা পূর্বে অর্জিত জ্ঞান বা অভিজ্ঞতার মাধ্যমে বর্তমানের বিভিন্ন সমস্যাসমাধানে সহায়ক হয়।

2. পৃথক্করণে এবং সামান্যীকরণে সহায়তা : কোনো বিশেষ পরিস্থিতির ভিতর অপ্রাসঙ্গিক বিষয়গুলি বাদ দিয়ে প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলিকে বেছে নেওয়াই হল পৃথক্করণ। আবার প্রাসঙ্গিক বিষয়গুলির সাহায্যে একটি সাধারণ সূত্র গঠন করাকে সামান্যীকরণ বলে। এই দুটি মানসিক প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে বুদ্ধিই প্রধান ভূমিকা পালন করে।

3. পরিবর্তিত পরিবেশে মানিয়ে নিতে সহায়তা : বুদ্ধির একটি  গুরুত্বপূর্ণ কাজ হল পরিবর্তিত পরিবেশে অর্থাৎ নতুন পরিবেশে মানিয়ে নিতে সাহায্য করা। মনোবিদ উইলিয়াম স্টার্নের বুদ্ধির সংজ্ঞায় এই বৈশিষ্ট্যটির কথা উল্লেখ রয়েছে।  তাঁর মতে, বুদ্ধি হল জীবনের নতুন সমস্যা বা অবস্থার সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার সাধারণ ক্ষমতা।

4. ক্ষিপ্রতা : বুদ্ধি হল এমন একটি মানসিক সামর্থ্য যা যথাসম্ভব অল্প সময়ের মধ্যে সমস্যাসমাধানে বিশেষ ভাবে সহায়তা করে। বুদ্ধির এই বৈশিষ্ট্যটি হল ক্ষিপ্রতা।

5. জটিল ও বিমূর্ত বিষয় চিন্তনে সহায়তা : বুদ্ধির সাহায্যে আমরা সূক্ষ্ম , জটিল এবং বিমূর্ত বিষয় নিয়ে চিন্তা করতে সক্ষম হয়। মনোবিদ টারম্যানের বুদ্ধির সংজ্ঞায় এই বৈশিষ্ট্যের কথা বলা হয়েছে। তার মতে, বুদ্ধি হল বিমূর্ত চিন্তনের ক্ষমতা।

6. সম্পর্ক নিয়ে সহায়তা : একাধিক বস্তু, ব্যক্তি বা ধারণার মধ্যে পারস্পরিক সম্পর্ক নির্ণয়ের ক্ষেত্রে বুদ্ধি আমাদের বিশেষ সহায়তা করে। তিনটি বালিকার মধ্যে কে লম্বা, কে বেঁটে এবং কে মাঝারি , তা নির্ণয়ের জন‍্য আমরা বুদ্ধির সম্পর্কঘটিত চিন্তনের সাহায্য গ্রহণ করি।

7. শিখনের ক্ষেত্রে সাহায্য : বুদ্ধি শিখনের ক্ষেত্রে বিশেষভাবে সাহায্য করে। বাকিংহাম, কলভিন প্রমুখ মনোবিদগণের বুদ্ধির সংজ্ঞায় এই বৈশিষ্ট্যের কথা রয়েছে। তাঁরা ব্যক্তির ক্ষমতাকেই ‘ বুদ্ধি ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন।

আরও পড়ুন :

বিস্মৃতি কাকে বলে ? বিস্মৃতির কারণ 

Leave a Comment