প্রেমেন্দ্র মিত্র জীবনী | সাহিত‍্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচনা | Biography Of Premendra Mitra

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

প্রেমেন্দ্র মিত্র জীবনী | সাহিত‍্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচনা | Biography Of Premendra Mitra

প্রেমেন্দ্র মিত্র : সুপ্রিয় পাঠকগন আমাদের এই নতুন পোষ্টে স্বাগতম , এই পর্বটিতে সাহিত‍্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র সম্পর্কে নিঁখুত ভাবে আলোচনা করেছি, যা আপনাদের জন‍্য খুবই হেল্পফুল হবে।

সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র :

ভূমিকা : কল্লোলকালের বিশিষ্ট সাহিত্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র ১৯০৪ খ্রিস্টাব্দে বারাণসীতে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি উপন্যাস অপেক্ষা ছোটোগল্প রচনায় অধিক কৃতিত্ব দাবি করেন। সেই সময়টা ছিল প্রতিবাদের, প্রতিরোধের এবং একইসঙ্গে বিদ্রোহী আবেগের।

উপন্যাস : তাঁর উপন্যাসের সংখ্যা প্রায় ২৫ টি। বিশিষ্ট রচনাগুলি মধ‍্যে উল্লেখযোগ্য হল-‘পাঁক’, ‘মিছিল’, বিসর্পিল’ , ‘হানাবাড়ি’, ‘পা বাড়ালেই রাস্তা’, ‘মনুদ্বাদশ’, ‘সূর্য কাঁদলে সোনা’ ইত্যাদি। ‘পাঁক’উপন্যাসে নিম্নবিত্ত মুচিপাড়ার দৈন্যচিত্র অঙ্কিত এবং একই সঙ্গে সমাজতন্ত্রের পথে উত্তরণের প্রয়াস আছে। ‘মিছিল’ উপন্যাসে অসহযোগ আন্দোলন, জেল এবং একইসঙ্গে দেশসেবার নামে ভণ্ডামি, মিথ্যাচার ও সুবিধাবাদী ভাবনার প্রকাশ ঘটেছে। ‘মনুদ্বাদশ’ উপন্যাসটি অল্প পরিসরে লেখা এবং এখানে পুরাণভাবনার সঙ্গে কল্পবিজ্ঞানের গল্প মিশে আছে। তাঁর উপন্যাস ও সাহিত্যের বড়ো বিষয় সমকালের সমাজের অসংগতি, অর্থনৈতিক সংকট, মধ্যবিত্তের জীবনযন্ত্রণা, বেকারত্বের যন্ত্রণা ইত্যাদি।

ছোটগল্প : প্রেমেন্দ্র মিত্র গল্প লেখা শুরু করেন ১৯২৪ খ্রীঃ থেকে এবং ধীরে ধীরে ছোটোগল্পে তাঁর অবিসংবাদী প্রতিভার সম্যক পরিচয় ও প্রতিষ্ঠার সময় এল। তাঁর বিশিষ্ট গল্পগ্রন্থগুলি হল-‘বেনামী বন্দর’, ‘পুতুল ও প্রতিমা’, ‘মৃত্তিকা’, ‘ধূলিধূসর’, ‘মহানগর’ ইত্যাদি। প্রথম গল্প ‘শুধু কেরানী’ ১৩৩০-এর চৈত্র সংখ্যা প্রবাসীতে প্রকাশিত। এই গল্পে কেরানি জীবনের দহন, অপ্রাপ্তির জ্বালা এবং বাস্তব জীবনের নিদারুণ যন্ত্রণা স্থান পেয়েছে। ‘পুন্নাম’ গল্পে বাৎসল্যের মধ্যেও নৈরাশ্য এবং ভীষণ আত্মপ্রবঞ্চনার পরিচয় আছে। ‘হয়তো’ ও ‘বিকৃত ক্ষুধার ফাঁদে’ গল্পে অস্থিরতা, অসংগতি এবং পরেরটিতে এক অসহায় নারীর জীবনকথা বর্ণিত। ‘চুরি’’ গল্পে শিক্ষক জীবনের দুর্বহ দুঃখকষ্টের চিত্র বর্ণিত। দারিদ্র্য যে নীতি ও আদর্শনিষ্ঠ মানুষকেও পথভ্রষ্ট করে তার পরিচয় আছে। সংসার সীমান্তে’, ‘মহানগর’ গল্পে জীবন যে কত অসহায় এবং মানুষকে বাঁচার অভিপ্রায়ে যন্ত্রণার ও ক্ষতবিক্ষত জীবনকে বেছে নিতে হয়-তার পরিচয় আছে।

জনপ্রিয় চরিত্র রচনা : উপন্যাস ও ছোটোগল্পের পাশাপাশি তাঁর অমর সৃষ্টি ‘ঘনাদা’ সিরিজ। যার আকর্ষণ বয়সনির্বিশেষে সকল বাঙালির মধ্যে আজও বিদ্যমান। ‘ঘনাদা’ চরিত্র রচনার স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৫৮ খ্রিস্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের পক্ষ থেকে তিনি শিশুসাহিত্য পুরস্কারে ভূষিত হন ।

অন‍্যান‍্য রচনা : ঘনাদা ছাড়াও তাঁর রয়েছে অপর একটি সৃষ্টি মেজকর্তা, যিনি বিখ্যাত ‘ভূত শিকারী’ হিসেবে। গোয়েন্দা পরাশর বর্মা-র বিভিন্ন গল্পেও লেখকের সুন্দর লেখনীর সাক্ষ্য পাওয়া যায়। প্রেমের চোখে পরাশর, ‘পরাশর বর্মা ও ভাঙ্গা রেডিও’ এক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য। তবে ‘মামাবাবু’ সিরিজ এককথায় অনবদ্য। ‘কুহকের দেশে’, ‘ড্রাগনের নিশ্বাস’ “মামাবাবুর প্রতিদান ইত্যাদি গল্পগুলি আজও অগণিত বাঙালি পাঠককে আকর্ষণ করে। তাঁর সাহিত্যভাণ্ডার অজস্র লেখায় পরিপূর্ণ।

তিনি লিখেছেন নানান কবিতাও। ‘প্রথমা’, ‘সম্রাট’, ফেরারি ফৌজ’, ‘সাগর থেকে ফেরা’ ইত্যাদি বিভিন্ন রচনা থেকে তাঁর কাব্যপ্রতিভার পরিচয় পাওয়া যায়। এ ছাড়া ১৯৬০ খ্রিস্টাব্দে অগাথা ক্রিস্টির ‘দি মাউসট্র্যাপ’ অনুসরণে একটি চলচ্চিত্র পরিচালনা করেন- ‘চুপি চুপি আসে’। ‘সমাধান’, ‘পথ বেঁধে দিল’, ‘হানাবাড়ি ইত্যাদি আরও বেশকিছু চলচ্চিত্রে পরিচালকের ভূমিকা পালন করেছিলেন তিনি।

বিভিন্ন পুরস্কার ও সম্মান : সাহিত্যরচনার স্বীকৃতিস্বরূপ পেয়েছেন একাধিক সম্মাননীয় পুরস্কার। ‘সাগর থেকে ফেরা’-র জন্য ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে পান সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কার। রবীন্দ্র পুরস্কার পান ১৯৫৮-তে। ১৯৭৩-এ পান আনন্দ পুরস্কার। পেয়েছেন পদ্মশ্রী এবং মৌচাক পুরস্কারও। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’-এ এবং ১৯৮৮-তে বিশ্বভারতী ‘দেশিকোত্তম’ উপাধিতে ভূষিত করে। ১৯৫৭ খ্রিস্টাব্দে জার্মানিতে অনুষ্ঠিত ‘ওয়ার্ল্ড পোয়েট্রি ফেস্টিভ্যালে’-এ তিনি ভারতের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

আরও পড়ুন : লালন ফকির টীকা 

মনস্তাত্ত্বিক গল্পে নিপুণতা : তবে তাঁর খ্যাতি মূলত মনস্তাত্ত্বিক গল্পরচনার জন্য। ‘শৃঙ্খল’, ‘স্টোভ’, ‘ভূমিকম্প’ প্রভৃতি গল্পে মনোবিকলন ও বর্তমান জীবনসংকট নিপুণভাবে আঁকা। রোমান্টিক ভাবনার যথার্থ পরিচয় আছে ‘তেলেনাপোতা আবিষ্কার’ গল্পে। গল্পকার হলেও তাঁর মধ্যে প্রকীর্ণ ছিল এক মায়াবী কবিসত্তা; যে গুণে তাঁর অনেক গল্পে কবিশক্তির তন্ময়তা, আবেগ, ব্যঞ্জনা ও প্রকৃতিপ্রীতির সার্বিক পরিচয় নিহিত। কবিত্বশক্তির স্পর্শ আছে ‘তেলেনাপোতা অবিষ্কার’ গল্পে। ম্যালেরিয়াপীড়িত তেলেনাপোতা গ্রামে মাছ ধরতে গিয়েছিলেন গল্পকথক ও তাঁর বন্ধু। সেখানে গিয়ে এক বিশেষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে একটা কিছু করার মানসিকতা জন্মায়, কিন্তু পরিণতিতে তেলেনাপোতা থেকে ফিরে এসে জীবনস্রোতে ভেসে যাওয়ায় স্বার্থপরতা নিশ্চিত হয়েছে এখানে।

উপসংহার : পরিশেষে বলা যায় যে, মূল্যবোধের ক্ষয়, নীতি ও আদর্শভ্রষ্ট জীবনের প্রতি আসক্তি এবং আত্মযন্ত্রণার দহনে দগ্ধ হওয়ার রূপময় বিন্যাস তাঁর গল্পের সম্পদ। এই বিশ্লেষণে প্রেমেন্দ্র মিত্র বাংলা ছোটোগল্পে সমাদৃত হয়ে থাকবেন। ১৯৮৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি শেষনিশ্বাস ত্যাগ করেন।

2 thoughts on “প্রেমেন্দ্র মিত্র জীবনী | সাহিত‍্যিক প্রেমেন্দ্র মিত্র রচনা | Biography Of Premendra Mitra”

Leave a Comment