বাষ্পমোচন কাকে বলে ? বাষ্পমোচনের গুরুত্ব, প্রকারভেদ, স্থান, সময়কাল ও প্রভাবক

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

বাষ্পমোচন কাকে বলে ? বাষ্পমোচনের গুরুত্ব, প্রকারভেদ, স্থান, সময়কাল ও প্রভাবক

বাষ্পমোচন কাকে বলে – What is Transpiration : সুপ্রিয় পাঠকগন আমাদের এই নতুন পোষ্টে স্বাগতম, এই পর্বটিতে আমরা বাষ্পমোচন কাকে বলে এবং বাষ্পমোচনের প্রকারভেদ, গুরুত্ব, স্থান, সময় ও প্রভাবক সম্পর্কে আলোচনা করেছি, যা আপনাদের জন‍্য খুবই হেল্পফুল হবে।

বাষ্পমোচন কাকে বলে : আজকের এই পর্বটিতে বাষ্পমোচন বা প্রস্বেদন সম্পর্কে বিস্তারিত তথ‍্য গুলি নিঁখুত ভাবে আলোচনা করা হয়েছে। আর দেরি না করে চলুন দেখে নেওয়া যাক বাষ্পমোচন কাকে বলে।

বাষ্পমোচন কাকে বলে :

যে শারীরবৃত্তীয় প্রক্রিয়ায় উদ্ভিদের বায়বীয় অংশ থেকে জল বাষ্পাকারে নির্গত হয়, তাকে বাষ্পমোচন বা প্রস্বেদন বলে।

বাষ্পমোচনের স্থান :

পাতা উদ্ভিদের বাষ্পমোচনের প্রধান স্থান। পাতার পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে অধিকাংশ বাষ্পমোচন ঘটে থাকে। এ ছাড়া পাতা ও কাণ্ডের ত্বকের কিউটিকল এবং লেন্টিসেল অল্প পরিমাণ বাষ্পমোচন করে।

বাষ্পমোচনের সময়কাল : বাষ্পমোচন প্রধানত দিনের বেলায় সম্পন্ন হয়। দিনের বেলায় পাতার পত্ররন্ধ্রগুলি উন্মুক্ত থাকে।

বাষ্পমোচনের প্রকারভেদ :

উদ্ভিদে নিম্নলিখিত চার প্রকারের বাষ্পমোচন লক্ষ করা যায় যথা সেগুলি নীচে আলোচনা করা হল-

i. পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে পাতার বাষ্পমোচন  : পাতার পৃষ্ঠতলে বা ত্বকে অসংখ্য ক্ষুদ্র, উপবৃত্তাকার ছিদ্র লক্ষ করা যায় যাদের পত্ররন্ধ্র বলে। প্রতিটি পত্ররন্দ্র দুটি বৃক্কের মতো বহিঃত্বকীয় কোশ দিয়ে আবৃত থাকে যাদের রক্ষীকোশ বলে। পত্ররন্ধ্রের চারপাশের ত্বককোশগুলিকে সম্পূরক কোশ বলে। প্রতিটি পত্ররন্ধ্রের নীচে একটি গহ্বর থাকে, তাকে উপ-পত্ররন্ধ্র কক্ষ বলে। রক্ষীকোশদুটি পত্ররন্ধ্রের বন্ধ ও উন্মোচন প্রক্রিয়াকে নিয়ন্ত্রণ করে। উদ্ভিদের মোট বাষ্পমোচনের অধিকাংশ বাষ্পমোচনই (50-97%) পত্ররন্ধ্রের মাধ্যমে সম্পন্ন হয় ।

ii. লেন্টিসেলীয় বাষ্পমোচন : উদ্ভিদের কান্ডের গায়ে কিছু সূক্ষ্ম ছিদ্র থাকে যাদের লেন্টিসেল বলে। লেন্টিসেলের মাধ্যমেও গুল্ম ও বৃক্ষজাতীয় উদ্ভিদে মোট বাষ্পমোচনের প্রায় 0.1% বাষ্পমোচন ঘটে।

iii. ত্বকীয় বাষ্পমোচন : পাতার ঊর্ধ্ব ও নিম্নত্বকের ওপরে অর্থাৎ বহিঃপ্রাচীরে কিউটিন নামক স্নেহপদার্থের যে আবরণী থাকে তাকে কিউটিকল বলে। কিউটিকল প্রধানত প্রস্বেদন রোধ করলেও কিউটিকল স্তরে উপস্থিত সূক্ষ্ম ফাটলের মাধ্যমেও বাষ্পমোচন ঘটে। কিউটিকল-এর পুরুত্ব অনুসারে বাষ্পমোচন হার নির্ভর করে। মেসোফাইট ও ছায়া প্রিয় উদ্ভিদে কিউটিকল খুব পাতলা এবং এরা কিউটিকলের মাধ্যমে মোট বাষ্পমোচনের 50% অবধি বাষ্পমোচন করতে পারে। অন্যান্য উদ্ভিদে মোট বাষ্পমোচনের 3-10% বাষ্পমোচন ত্বকের মাধ্যমে ঘটে।

iv. বাকল বাষ্পমোচন : এই প্রকার বাষ্পমোচন কাষ্ঠল কাণ্ডের বাকলের মাধ্যমে ঘটে। বাকলের বহির্ভাগ জলনিরোধী কর্ক দ্বারা আবৃত থাকলেও সামান্য পরিমাণ জল বাকলের মাধ্যমে ব্যাপিত হয়ে পরিবেশে মুক্ত হয়। 24 ঘণ্টায় মোট বাষ্পমোচনের 0.5% বাষ্পমোচন বাকলের মাধ্যমে ঘটে।

দিনের বেলায় পত্ররন্ধ্র খোলা থাকে ও রাত্রিবেলায় বন্ধ থাকে বলে পত্ররন্দ্রীয় বাষ্পমোচন শুধু দিনের বেলায় হয়। যে সমস্ত উদ্ভিদ ক্রাসুলেসিয়ান অ্যাসিড বিপাক সম্পন্ন করে তাদের ক্ষেত্রে পত্ররন্ধ্র রাত্রি বেলায় উন্মোচিত হয়। উদাহরণ- পাথরকুচি। অপরদিকে লেন্টিসেল ও ত্বকের মাধ্যমে দিবরাত্র সর্বদাই স্বল্প পরিমাণে বাষ্পমোচন হয়।

বাষ্পমোচনের প্রভাবক :

1. বহিঃপ্রভাবক :

a. কার্বন ডাইঅক্সাইড : বাতাসে CO2-এর ঘনত্ব বাড়লে তা পত্ররন্ধ্রের নির্মীলন ঘটায় আবার CO2 মুক্ত বায়ুতে পত্ররন্ধ্র অন্ধকারেও উন্মোচিত হয়। CO2-এর প্রভাবে রক্ষীকোশ থেকে K+ আয়নের নির্গমন ঘটে ও এর ফলে পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়।

b. বায়ুর আর্দ্রতা : বাতাসের আর্দ্রতা বেশি হলে অর্থাৎ জলীয় বাষ্পের পরিমাণ বৃদ্ধি পেলে বাষ্পমোচনের হার কমে যায়। অপরদিকে বায়ুর আর্দ্রতা কম হলে বাষ্পমোচনের হার বেড়ে যায়।

c. উষ্ণতা : তাপমাত্রা বৃদ্ধি পেলে পত্ররন্ধ্র বেশি উন্মোচিত হয় ফলে উয়তার প্রভাবে গ্রীষ্মকালে বাষ্পমোচনের হার বেশি হয়।

d. বায়ুপ্রবাহ : দ্রুত বায়ু প্রবাহের ফলে পাতার নিকটবর্তী অঞ্চল থেকে জলীয় বাষ্প অপসারিত হয় বলে বাষ্পমোচনের হারও বেড়ে যায়। প্রবল বায়ুপ্রবাহে পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়ে যায় এবং পত্রপৃষ্ঠ শীতল হয়ে পড়ে, ফলে বাষ্পমোচনের হার কমে যায়।

e. আলো : আলোর উপস্থিতিতে বাষ্পমোচনের হার বেড়ে যায় ।

f. বায়ুমন্ডলীয় চাপ : বায়ুমণ্ডলের চাপ হ্রাস পেলে ব্যাপন প্রক্রিয়া বেড়ে যায়- ফলস্বরূপ বাষ্পমোচন বৃদ্ধি পায়।

g. জলের লভ্যতা : মাটিতে পর্যাপ্ত জল থাকলে জলের শোষণ হার বাড়ে, ফলে বাষ্পমোচনের হারও বাড়ে। মাটিতে অপর্যাপ্ত জল বাষ্পমোচনের হার হ্রাস করে।

2. অন্তঃপ্রভাবক :

a. পত্ররন্ধ্রের সংখ্যা ও গঠন প্রকৃতি : পাতার একক আয়তনে পত্ররন্ধ্রের সংখ্যা বেশি হলে বাষ্পমোচনের হারও বেশি হয়। এছাড়া করবী জাতীয় গাছের পত্ররন্দ্র নিবেশিত অবস্থায় থাকে বলে বাষ্পমোচনের হার কম হয়। উদ্ভিদভেদে একক আয়তনে পত্ররন্ধ্রের সংখ্যার হেরফের দেখা যায়। প্রতি বর্গ সেন্টিমিটারে উদ্ভিদের পাতায় 2,000-60,000টি পত্ররন্দ্র থাকে।

b. পাতার গঠন বৈশিষ্ট্য : i. ফণীমনসা গাছের পাতা কণ্টকে রূপান্তরিত হয় বলে বাষ্পমোচনের হার অত্যন্ত কম হয়। ii. পাইন জাতীয় সূচ্যাকার পত্রে বাষ্পমোচন কম হয়। iii. পাতার ত্বকে কিউটিনের মোটা প্রলেপ বাষ্পমোচন প্রতিরোধ করে। iv. পাতার অতিরিক্ত রোম বা শল্ক থাকলে আলোক শোষণ কম হওয়ার ফলে বাষ্পমোচনের হারও কমে যায়।

c. হরমোন : অ্যাবসিসিক অ্যাসিড নামক হরমোনের প্রভাবে পত্ররন্ধ্র বন্ধ হয়ে যায় ফলে এই হরমোন বাষ্পমোচন প্রতিরোধ করে। সাইটোকাইনিন হরমোন পত্ররন্ধ্রের উন্মোচন ঘটিয়ে বাষ্পমোচনের হার বৃদ্ধি করে।

d. মূল-বিটপ অনুপাত : মূল-বিটপ অনুপাত বেশি হলে জল শোষণ হার বাড়ে ফলে বাষ্পমোচনের হারও বাড়ে। মূল-বিটপ অনুপাত কম হলে বাষ্পমোচন হার কমে।

e. বয়স : বয়স্ক পাতায় বাষ্পমোচন হার কম হয়।

f. দ্রাবের ঘনত্ব : কোশীয় দ্রবণে দ্রাবের ঘনত্ব যত বেশি হয় বাষ্পমোচনের হারও তত কম হয় কারণ দ্রাবের ঘনত্ব বাষ্পীভবনকে প্রভাবিত করে।

বাষ্পমোচনের গুরুত্ব :

a. জল শোষণ : বাষ্পমোচনের ফলে কোশের মধ্যে ব্যাপন চাপ ঘাটতি দেখা যায় যার প্রভাবে মূল দিয়ে খনিজ লবণ মিশ্রিত জল শোষিত হয়।

b. রসের উৎস্রোত : বাষ্পমোচনের জন্য পাতার মেসোফিল কলায় জলের ঘাটতি দেখা যায়, যার ফলে মেসোফিল কলাসংলগ্ন জাইলেম বাহিকায় শূন্যস্থানের সৃষ্টি হয়। একে বাষ্পমোচন জনিত চোষণ চাপ বলে। এই শূন্যস্থান পূরণ করার জন্য জাইলেম বাহিকা দিয়ে মৃত্তিকার খনিজ লবণমিশ্রিত জল ঊর্ধমুখে প্রবাহিত হয় যাকে রসের উৎস্রোত বলে।

c. পত্রতলের উষ্ণতা হ্রাস : বাষ্পমোচনের সময় পত্রতল থেকে বাষ্পীভবনের লীনতাপ গৃহীত হয় ফলে উয় পরিবেশেও পাতার তাপমাত্রা কম থাকে। সূর্যমুখীর পাতা প্রতি ঘণ্টায় 996mg/dm2 জল বাষ্পমোচনের ফলে নির্গত করলে পাতার উষ্ণতা প্রায় ৪°C হ্রাস পায়।

d. রসস্ফীত চাপ বজায় রাখা : বাষ্পমোচনের মাধ্যমে অতিরিক্ত জল নির্গত হয় যার ফলে মেসোফিল কলার স্বাভাবিক রসস্ফীত চাপ বজায় থাকে।

e. প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল অপসারণ : উদ্ভিদ মূল দিয়ে যে পরিমাণ জল শোষণ করে দেখা গেছে যে বিপাকীয় ক্রিয়ার জন্য তার মাত্র 1% জল ব্যবহৃত হয়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত জল বাষ্পমোচনের মাধ্যমে অপসারিত হয়। এই অতিরিক্ত জল দেহ কোশে সঞ্জিত হলে কোশের রসস্ফীত চাপ খুব বেড়ে যেত এবং উদ্ভিদ কলায় শোথজাতীয় রোগ লক্ষণ দেখা দিত এবং পচনের ফলে উদ্ভিদের মৃত্যু হত।

f. ক্ষতিকারক ভূমিকা : দেখা গেছে যে গ্রীষ্মকালে মাটিতে জলাভাব দেখা দিলেও আলো ও তাপের প্রভাবে পত্ররন্ধ্র বেশি উন্মোচিত হয়। এই কারণে অতিরিক্ত বাষ্পমোচনের ফলে উদ্ভিদে জলের ভারসাম্য নষ্ট হয়। উদ্ভিদ কলায় জলের ঘাটতি দেখা যায় এবং রসস্ফীত চাপ কমে যাওয়ায় গাছের পাতা নেতিয়ে যায়। এই লক্ষণকে উইলটিং বলে। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চললে। গাছ মারা যেতে পারে।

এই আলোচনা থেকে আমরা জানতে পারি যে বাষ্পমোচনের অনেকগুলি উপকারী ভূমিকা থাকলেও গ্রীষ্মকালে জলাভাবের সময় বাষ্পমোচন চলতে থাকলে জলসংকটের ফলে পাতা নেতিয়ে পড়ে ও গাছ মারা যেতে পারে। এই কারণে বাষ্পমোচনকে ‘প্রয়োজনীয় ক্ষতি’ বলা হয় ।

আরও পড়ুন :

অভিস্রবণ কাকে বলে ? অভিস্রবণের প্রকারভেদ, গুরুত্ব ও শর্তাবলি ?

রসের উৎস্রোত কাকে বলে এবং পরীক্ষা ও মতবাদ ?

Leave a Comment