প্রাণী কলা কাকে বলে ? কলার প্রকারভেদ ও উৎস

টেলিগ্ৰামে জয়েন করুন

প্রাণী কলা কাকে বলে : সুপ্রিয় বন্ধুরা আজকের এই পর্বটিতে তোমাদের সাথে আলোচনা করলাম কলা কাকে বলে ? প্রাণী কলার প্রকারভেদপ্রাণী কলার উৎস সম্পর্কে।

প্রাণী কলা কাকে বলে ? প্রাণী কলার প্রকারভেদ ও উৎস

এককোশী প্রাণীর ক্ষেত্রে দেহ একটিমাত্র কোশ দ্বারা গঠিত যা সকল প্রকার জৈবনিক কার্য সম্পাদনে সক্ষম। সরল বহুকোশী জীবদেহ কতকগুলি কোশের সমন্বয়ে সৃষ্টি হয়; এদের দেহে সঠিক শ্রমবিভাগ অনুপস্থিত। কিন্তু উন্নত বহুকোশীদের দেহ কতকগুলি সমজাত এবং সমধর্মী কোশ মিলিত হয়ে গঠন করে কলা। কতকগুলি কলা মিলে গঠিত হয় একটি অঙ্গ, আবার কতকগুলি অঙ্গের সমন্বয়ে গঠিত হয় একটি তন্ত্র।

কোশ >  কলা > অঙ্গ > তন্ত্র

স্পঞ্জ জাতীয় প্রাণীদের মধ্যে কোশগুলির শ্রমবিভাগ ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা খুব স্পষ্ট নয়। নিডারিয়া পর্বভুক্ত প্রাণীদের মধ্যে শ্রমবিভাগ ও পারস্পরিক নির্ভরশীলতা একটু বৃদ্ধি পেয়েছে ঠিকই কিন্তু অঙ্গ-তন্ত্র তৈরি হয়নি। এই কারণে এদের tissue grade প্রাণী বলে। অপরপক্ষে, ফিতাকৃমি থেকে শুরু করে স্তন্যপায়ী পর্যন্ত সব প্রাণীর দেহে কলা ও কলাতন্ত্রের এবং অঙ্গতন্ত্রের ক্রমোন্নতি ঘটেছে।

প্রাণী কলা কাকে বলে :

আকৃতি, উৎপত্তিস্থান ও কার্যপ্রণালী এক, প্রাণীদেহে এরূপ কোশ সমষ্টিকে প্রাণী কলা বলে। ‘কলা’ শব্দটি জীব বিজ্ঞানে প্রথম প্রচলন করেন Bichet যদিও Marcello Malpighi কলার উপর পড়াশোনার জন্য হিস্টোলজি নামে একটি শাখা খোলেন। Histology শব্দটি প্রবর্তন করেন– Meyer 1819 সালে।

কলার প্রকারভেদ :

কলা প্রধানত চার প্রকার যথা- 1.আবরণী বা এপিথেলীয় কলা- আচ্ছাদনকারী এবং গ্রন্থিময় কলা। 2. যোগ কলা -বহনকারী কলা। 3. পেশি কলা- সংকোচনশলী কলা। 4. স্নায়ু কলা- স্পন্দন সৃষ্টি ও পরিবহণ কলা।

কলার উৎস :

1. এপিথেলিয়াম কলা- এক্টোডার্ম, মেসোডার্ম এবং এন্ডোডার্ম থেকে। 2.  যোগ কলা বা যোজক কলা- মেসোডার্ম থেকে। 3. পেশিকলা- মেসোডার্ম থেকে। 4. স্নায়ুকলা- এক্টোডার্ম থেকে।

1. আবরণী কলা :

এপিথেলিয়াম শব্দটি গ্রিক শব্দ epi = upon এবং thelio = grows থেকে সৃষ্টি হয়েছে। ডাচ anatomist Ruysch প্রথম এই কলা পর্যবেক্ষণ করেন। এপিথিলিয়াম কলা কোশের চাদর যা দেহ-পরিধিকে এবং অঙ্গাদির মুক্ত তলকে ঢেকে রাখে। বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ অঙ্গে এপিথেলীয় কলার নিরবচ্ছিন্ন আবরণ থাকে শুধু তাই নয়, দেহের বহিঃতলও এপিথেলীয় কলা দ্বারা আবৃত। এই কলার কোশগুলি এক বা একাধিক স্তরে সজ্জিত থাকে। আন্তঃকোশীয় শূন্যস্থান থাকে না। কোশগুলি অকোশীয় ভিত্তিপর্দার উপর সজ্জিত থাকে। রাসায়নিক ভাবে ভিত্তিপর্দা হলো মিউকোপলিস্যাকারাইড। ব্যাপন পদ্ধতিতে এপিথেলীয় কলার মাধ্যমে বিভিন্ন বস্তুর বিনিময় ঘটে। এই কলার কোশগুলি পরপর এক প্রকার খুব অল্প পরিমাণ সংযোজক পদার্থ দ্বারা যুক্ত থাকে। এই কলায় সংবহন তন্ত্র অনুপস্থিত, তবে কিছু স্নায়ুসূত্র এবং সঞ্চারণশীল কোশ থাকে। ধাত্র বস্তু খুবই কম। এই কলায় খাদ্যবস্তু বহন করে আন্তঃকোশ তরলই।

● আবরণী কলা কাকে বলে :

যে কলা প্রাণীদেহের ত্বক ও বিভিন্ন অঙ্গ ও তন্ত্রের মুক্ত তলে আবরণী বা আচ্ছাদন তৈরি করে, তাকে আবরণী কলা বা এপিথেলীয় কলা বলে।

● আবরণী কলার বৈশিষ্ট্য :

এই কলার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য গুলি হলো –

i. এই কলা তিনটি জৈবিক স্তর থেকে অর্থাৎ এক্টোডার্ম, মেসোডার্ম এবং এন্ডোডার্ম থেকে উৎপন্ন হয়।

ii. এই কলার কোশগুলি ঘন সন্নিবিষ্ট থাকে এবং একে অপরকে স্বল্প আন্তঃকোশীয় ধাত্র দ্বারা ধরে রাখে; আবার অনেক ক্ষেত্রে আন্তঃকোশীয় ধাত্র নাও থাকতে পারে।

iii. এপিথেলীয় কোশ স্বচ্ছ অকোশীয় ভিত্তিপর্দার উপর অবস্থান করে। এতে কোলাজেন নামে একপ্রকার বিশেষ ধাত্র-প্রোটিন থাকে।

iv. এই কলার কোশগুলি বিভিন্ন আন্তঃকোশীয় সন্ধি দ্বারা একে অপরের সঙ্গে যুক্ত থাকে।

v. এপিথেলীয় কোশ কোশতলের বিশিষ্টতা প্রদর্শন করে, যথা- মাইক্রোভিল্লি, সিলিয়া, ফ্ল্যাজেলা, স্টিরিওসিলিয়া, কাইনোসিলিয়া ইত্যাদি।

vi. এপিথেলীয় কোশ বিনষ্ট হতে পারে, ছিঁড়ে যেতে পারে, আঘাতপ্রাপ্ত হতে পারে।

vii. এর কোশগুলি মাইটোসিস প্রক্রিয়ায় বিভাজিত হয়ে ধ্বংসপ্রাপ্ত কোশগুলির স্থানে নতুন কোশ উৎপাদন করে।

viii. কোশগুলি এক বা একাধিক স্তরে সজ্জিত থেকে কোন অঙ্গ বা দেহগহ্বরের গাত্র বা বিভিন্ন অঙ্গের লুমেনকে আবৃত করে।

ix. পাশাপাশি কোশগুলি আন্তঃকোশীয় ফিলামেন্ট দ্বারা পরস্পর সংলগ্ন থাকে।

2. যোজক কলা বা যোগ কলা :

যোজক কলা বা যোগ কলা দেহের বিভিন্ন অঙ্গসমূহের মধ্যে সংযোগ রক্ষা করে, এজন্য একে binding tissue বলে। যোজক কলা সমগ্র দেহের শতকরা 30 ভাগ। মেসোডার্ম থেকে যোজক কলা উৎপন্ন হয়।

● যোগ কলা কাকে বলে :

যে কলা দেহের বিভিন্ন কলা ও অঙ্গসমূহের মধ্যে সংযোগ স্থাপন করে, তাকে যোগ কলা বলে।

● যোগ কলার বৈশিষ্ট্য :

এই কলার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য গুলি হলো-

i. যোজক কলা আদি ভ্রূণের মেসোডার্ম থেকে উৎপন্ন হয়।

ii. এই কলার ধাত্রের (অন্তঃকোশীয় পদার্থ) পরিমাণ বেশি এবং কোশের সংখ্যা কম।

iii. অন্তঃকোশীয় পদার্থ তরল, অর্ধকঠিন বা কঠিন হতে পারে।

iv. অন্তঃকোশীয় পদার্থে বিভিন্ন প্রকার তত্ত্বজাতীয় উপাদান থাকতে পারে।

● যোগ কলার কাজ :

এই কলার কাজ গুলি হলো –

i. যোজক কলা বিভিন্ন কলাকে একত্রে বন্ধন ঘটায় এবং যথাযথ অবস্থান বজায় রাখে।

ii. মৃত এবং বিনষ্ট কলাকে প্রতিস্থাপিত করতে সাহায্য করে এবং এভাবে পুনরুৎপাদন এবং কলা মেরামতিতে সাহায্য করে।

iii. ইহা দেহের প্রতিরক্ষায় সাহায্য করে এবং দেহের প্রবেশ করে এমন ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া এবং বিষাক্ত বস্তু থেকে দেহকে রক্ষা করে।

iv. দেহ ধারণ বা অবলম্বন করার জন্য কঙ্কাল তৈরি করে।

v. জেলির মতো ধাত্র shock- absorber-এর কাজ করে।

vi. দেহের কোনো কোনো অংশে ফ্যাট সঞয়ে সাহায্য করে।

3. পেশি কলা :

পেশি কলা দেহের গমন এবং অভ্যন্তরীণ অঙ্গের আকারের পরিবর্তনের জন্য দায়ী। এর বিশেষত্ব হল এটি বিশেষ ধরনের কোশগুচ্ছ নিয়ে গঠিত, যাকে পেশি কোশ বলে, এবং যাদের প্রাথমিক ভূমিকা হচ্ছে সংকোচন। পেশি কোশগুলি লম্বাটে এবং সমান্তরাল ভাবে থাকে এবং কার্যকারী এককরূপে কাজ করে। পেশি কোশের সাইটোপ্লাজমে বেশিরভাগ অংশই দখল করে থাকে দু-ধরনের মায়োফিলামেন্ট যারা সংকোচন কাজের সঙ্গে সম্পর্কিত।

মায়োফিলামেন্ট দু-রকমের, যথা-

a. পাতলা ফিলামেন্ট  : এগুলি 6-9 nm ব্যাসযুক্ত এবং প্রাথমিকভাবে অ্যাকটিন প্রোটিন দ্বারা গঠিত।

b. পুরু ফিলামেন্ট : এগুলি প্রায় 15 nm ব্যাসযুক্ত এবং মায়োসিন প্রোটিন দ্বারা গঠিত।

● পেশি কলার উৎস :

i. পেশি কলা উৎপন্ন হয় মেসোডার্ম নামক ভ্রূণস্তর থেকে।

ii. এক্টোডার্ম নামক ভ্রূণস্তর থেকে উৎপন্ন হয় লোমকূপের গোড়ার পেশি, স্ফিংটার, ডায়ালেটর পিউপিলী এবং আইরিশ, ঘর্মগ্রন্থির মায়োএপিথেলীয় কোশ।

● পেশি কলা কাকে বলে :

মায়োফাইব্রিলযুক্ত পেশি কোশ দ্বারা গঠিত সংকোচনশীল কলাকে পেশি কলা বলে।

● পেশি কলার বৈশিষ্ট্য :

এই কলার গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য গুলি হলো

i. পেশি কলা পেশি কোশ (পেশিতন্তু), যোগ কলা, স্নায়ু এবং স্নায়ুপ্রান্ত দ্বারা গঠিত।

ii. পেশি কোশগুলি লম্বাকৃতি হওয়ার জন্য এদের পেশিতন্তুও বলে।

iii. পেশি কলা কতকগুলি পেশি কোশ দ্বারা গঠিত।

iv. কোশে একাধিক নিউক্লিয়াস থাকে।

v. স্থিতিস্থাপকতা, সংবহনশীলতা পেশি কলার ধর্ম।

vi. পেশি কলার শক্তির উৎস খাদ্যের বিপাকজনিত শক্তি থেকে।

vii. পেশি কোশের সাইটোপ্লাজমকে বলে সারকোপ্লাজম এবং কোশাবৃত পর্দাকে বলে সারকোলেমা। সারকোমিয়ার হল পেশি কোশের সংকোচনশীল একক।

viii. পেশি কলা রাসায়নিক শক্তিকে যান্ত্রিক শক্তিতে রূপান্তরিত করে।

4. স্নায়ুকলা :

উচ্চশ্রেণির প্রাণীতে যেসব কোশ স্নায়ুকলা গঠন করে সেগুলির গঠন বৈশিষ্ট্য হল দেহের এক অংশের সংবাদ গ্রহণ এবং অপর দেহাংশে সংবাদ প্রেরণ। পরিবেশের যে-কোনো পরিবর্তন বা দেহের ভেতরের কোনও পরিবর্তন উদ্দীপক হিসেবে কাজ করে। কোনো প্রদত্ত উদ্দীপনায়, এই কোশগুলি উত্তেজিত হয় এবং উদ্দীপনা স্নায়ু তন্তু মারফত নির্দিষ্ট অঙ্গে পরিবাহিত হয়। সুতরাং উত্তেজিতা এবং সংবাহিতা এই দুটি হল স্নায়ুকলার প্রাথমিক ধর্ম। স্নায়ুকলা প্রধানত স্নায়ুকোশ ও স্নায়ুতন্তু দিয়ে গঠিত।

● স্নায়ুকলা কাকে বলে :

স্নায়ুকোশ দ্বারা গঠিত যে কলা যা প্রাণীদেহে বিভিন্ন উদ্দীপনা গ্রহণ, উদ্দীপনা প্রেরণ, উদ্দীপনায় সাড়া দেওয়া ইত্যাদি কাজগুলির সঙ্গে সম্পর্কিত,তাকে স্নায়ু কলা বলে।

● স্নায়ুকলার কাজ :

এই কলার কাজ গুলি হলো – 

i. তড়িৎ রাসায়নিক পদ্ধতিতে জীবদেহের বিভিন্ন অঙ্গ এবং তাদের কাজের মধ্যে সংহতি সাধন করে স্নায়ু কলা।

ii. অ্যাক্সন অপর নিউরোনের ডেনড্রনের কাছে বিন্যস্ত হয়, বা অ্যাক্সন পেশিতন্তুর মধ্যে প্রবেশ করে। এই সংযোগস্থলকে সাইন্যাপস বলে।

iii. এক প্রকার রাসায়নিক বস্তু সাইন্যাপসের ডেনড্রন ও অ্যাক্সনের শাখা-প্রশাখার মধ্যে যোগসূত্র ঘটায়। এই রাসায়নিক পদার্থটিকে নিউরোহিউমর বলে। বিভিন্ন স্নায়ুপ্রেরক পদার্থ, যথা- অ্যাসিটাইল কোলিন, নর-অ্যাড্রিনালিন স্নায়ুকলাতে সর্বদা একই দিকে স্নায়ু সংবেদ ইত্যাদি পরিবাহিত করে।

আরও পড়ুন :

সংবহন কলা কাকে বলে ? সংবহন কলার গঠন, উৎপত্তি, অবস্থান ও কাজ ?

1 thought on “প্রাণী কলা কাকে বলে ? কলার প্রকারভেদ ও উৎস”

Leave a Comment